প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক সংগ্রাম

52

ঔপনিবেশিক শাসকদের কূটকৌশল ও বিভাজন নীতির প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। ঐতিহাসিক সত্য এই যে, পাকিস্তান গঠনে বড় ভূমিকা রাখে বাঙালি মুসলমান।

তবে তাদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটতে দেরি হয়নি। নতুন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নব্য উপনিবেশবাদীদের চেহারা স্পষ্ট হয়। বাংলাভাষার আন্দোলন সেই স্বপ্নভঙ্গেরই প্রথম বিস্ফোরণ।

বায়ান্নোর বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সদ্য জন্ম নেয়া পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীরা তাদের হারানো জাতিসত্তা খুঁজে পায়। তারা একক ও অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার পুনর্জাগরণ ঘটায়।

যে সাম্প্রদায়িকতা পাকিস্তান সৃষ্টি করে, সেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই বাঙালি জনগোষ্ঠী রুখে দাঁড়ায়। সেটি ছিল এক তাৎপর্যময় জাতীয় উন্মেষ, একটি নবজাগরণ, যা বাঙালিকে নতুন করে আত্মসচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হওয়ার পথ দেখায়।

বলাবাহুল্য, বায়ান্নোর ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তার যে স্ফুরণ ঘটে, তা আর থেমে থাকে না। ১৯ বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালি গণমানুষ আত্মানুসন্ধান করে, পরিশুদ্ধ হয়। এবং সেই আত্মানুসন্ধানের বাঁকে বাঁকে জাতি অগ্রসর হয়, পৌঁছে যায় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত রণাঙ্গনে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাতাবরণে এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চায় বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মনোজগতে জাতি-পরিচয়ের যে দ্বন্দ্ব বা সংকট তৈরি হয়, বাংলা ভাষা আন্দোলন সে সংকট বা দ্বন্দ্ব ভাঙতে থাকে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীরা, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান নির্বিশেষে, নতুন উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়। ভাষা ও সংস্কৃতির বাঁধন ধর্মের বাঁধনকে ছাপিয়ে দেয়। যেন অন্ধকার থেকে আলোতে আসে তারা।

নতুন সে পথেই জাতি এগিয়ে যেতে থাকে। পাকিস্তানের মেকি ধর্ম বাঁধন কিংবা বর্বর সামরিক আধিপত্য, কিছুই তাকে বাঁধতে পারে না। বাঙালি নিজেকে আবিষ্কার করে। তার আত্মপরিচয়ের সংকট ঘুঁচতে থাকে। ধর্ম ও সামরিক আধিপত্য যত তাকে বাঁধতে চায়, তত তার মোহমুক্তি ঘটে। বেগবান হয় বাঙালির আত্মপরিচয় অন্বেষণ।

এ প্রগতিশীল উত্তরণের নানা অবস্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভূমিকা রাখেন। তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে ছাত্র বা তারুণ্যের আন্দোলন। বলাবাহুল্য, মুখ্য ভূমিকা রাখেন বাঙালির মুখ্য জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার ঐতিহাসিক ছয়দফা আন্দোলন।

এসবের ধারাবাহিকতায় আসে উনসত্তরের গণবিস্ফোরণ, ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। পরিশেষে আসে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ যা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির যে দীর্ঘ পথপরিক্রমা তাতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি বড় অংশীদারিত্ব আছে। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ধারাবাহিক ভাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন করেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে, সাম্প্রদায়িক সাহিত্যের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত জাগিয়ে তোলেন।

ঢাকার কার্জন হলে আয়োজিত ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা ও অসাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার যুগান্তকারী বক্তব্য রাখেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানের দাড়ি-টিকি, লুঙ্গি-ধুতির পার্থক্যকে বাহ্য বিষয় আখ্যা দেন, বলেন, বাঙালির অন্তরে মা প্রকৃতি তাদের এক বাঙালি করেই সৃষ্টি করেছেন।

বলাবাহুল্য, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ভিত্তি স্থাপন করলেও গোটা জনগোষ্ঠীর মনোজগতে মহাবীক্ষার যে বহ্নিশিখা প্রজ্ব¡লিত হয়েছিল, তার মুখ্য কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি বঞ্চিত, অবহেলিত জাতির বুকে বল দিয়েছেন, কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছেন, চোখে দিয়েছেন স্বপ্ন, জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার ও অধিকার বা আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করেছেন, প্রতিরোধে দাঁড়াবার শক্তি জুগিয়েছেন। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন।

কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত হবে যে, বায়ান্নো ও মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের রক্তে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ, সেই সাম্প্রদায়িক শক্তি আজও আত্মসমর্পণ করেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আত্মসমর্পণ করলেও এসব অপশক্তি আজও নানা অঙ্গনে সক্রিয়।

পুনর্জাগরিত এ বিষবৃক্ষগুলো বাঙালির শাশ্বত উদারতাকে গ্রাস করতে উদ্যত। অতএব আত্মতুষ্টির সুযোগ কম। এক-দুটি নির্বাচনী বিজয় রাজনৈতিক শক্তির অধিষ্ঠান ঘটায় বটে, কিন্তু সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের পূর্ণ মেরামত ঘটে না।

অতএব বাঙালি জীবনে আরেকটি বড় লড়াই প্রয়োজন। সে লড়াই সংস্কৃতির লড়াই। বায়ান্নোর ও একাত্তরের চেতনা পুনঃস্থাপনের লড়াই। মানবিক, আধুনিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ লড়াইয়ের বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।

মন্তব্য
Loading...