নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এক নামেই যাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি, তিনি এখন বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের নাম! আওয়ামী শাসনের পতনের পর দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ পাওয়া এই ব্যক্তিত্বের ১৮ মাসে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বাংলাদেশ। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা, বেপরোয়া মব সন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা, মাজার-মন্দির-গণমাধ্যমে নির্বিচারে আগুন, লুটপাটে পুরো দেশকে রীতিমতো কারাগারে পরিণত করা হয়। ব্যবসায়ীদের অবজ্ঞা-অবহেলা, হয়রানিমূলক মামলা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, কারখানা বন্ধ, লাখো লোকের চাকরি হারানো, আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজারকে তলানিতে নামিয়ে আর উচ্চমূল্যস্ফীতির তাপে সাধারণ মানুষের জীবন পুড়িয়ে একেবারে বিষিয়ে তোলা হয়।
এ সময় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ শতাংশ। উচ্চ সুদের হারে বিনিয়োগে স্থবিরতা চরমে। অন্তর্বর্তী সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে এসে ৫৮ শতাংশ কমে। দেশের বড় প্রকল্পগুলো বন্ধ রেখে, এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড অদক্ষতা অথচ বিদেশি ঋণ বা ধারকর্যে কয়েক গুণ বেশি পারদর্শিতা বাংলাদেশকে এগোনোর বদলে বরং পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন অমনোযোগ এখন শিশু হত্যার নির্মম-নিষ্ঠুর চিত্র সামনে এসেছে। তথ্য-উপাত্ত আর ব্যবসায়ী-বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে। মানুষের অনেক আশা ছিল, এই ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নেবেন। ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ-সাধারণ জনতা সবাই আশায় বুক বাঁধে।
কিন্তু সবকিছুতে নির্বিকার থাকায় দেশে এক ধরনের নৈরাজ্য শুরু হয়। পুরো সময়কালে একবারের জন্যও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি। বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ আহবানও জানাননি। ফলে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায়, হতাশায় সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। গতকাল খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই জাতীয় সংসদে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে দারিদ্র্য কমেনি বরং বেড়েছে।
মব সন্ত্রাস : বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪২৮টি মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, যা গত বছরের (২০২৪) তুলনায় তিন গুণ। এ ঘটনায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছেন ও ৪৬০ জন আহত হয়েছেন। ২২০ জনকে আহতাবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত ১৬২ জনের মধ্যে চুরির অপবাদ, সন্দেহে ৪১ জন, ডাকাতির অভিযোগে ও সন্দেহে ২২ জন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ২৫ জন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযেগে আটজন, প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার অভিযোগে একজন, হত্যা মামলায় অভিযুক্ত পাঁচজন, চোরাকারবারি/মাদক ব্যবসার অভিযোগে চারজন, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকর্মী সন্দেহে এবং রাজনৈতিক রোষানলের কারণে ছয়জন, মাদক কারবারি কটূক্তি, চোরাকারবারি, অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও সন্দেহে, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, বাগিবতণ্ডা মনোমালিন্য, যৌন হয়রানি, পূর্বশত্রুতা এবং অন্যান্য আপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৫৪ জন রয়েছেন। গণপিটুনির ঘটনায় আহত ৪৬০ জনের মধ্যে ৫৫ জন আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ সদস্য।
রাজনৈতিক সহিংসতা : গত এক বছরে (২০২৫) দেশে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাত হাজার ৫১১ জন। এর বাইরে দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা হয়েছে। সেই সঙ্গে হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩৯ জন সাংবাদিক। সূত্র পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৫) সারা দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ মাসে বিভিন্ন থানায় তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। এই হিসাবে ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসের চেয়ে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ২৮১টি হত্যা মামলা বেশি হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, দেশে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনায় গত বছরের (২০২৫) আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে অপরাধমূলক ঘটনায় সারা দেশে ৩৯ হাজার ৯৩৬টি মামলা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে মামলা তিন হাজার ৭২টি। এই হিসাবে প্রতিদিন মামলা ৭২টি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে এসব অপরাধের ঘটনায় ৩৬ হাজার ৩১৫টি মামলা হয়। এতে একই সময়ের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় তিন হাজার ২১টি মামলা বেশি হয়।
অর্থনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা : ব্যাংকিং খাতে গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণে এক অভাবনীয় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়। মাত্র এক বছরে বেড়েছে তিন লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এ তিন মাসেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১.৩০ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২.২১ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট ঋণ ছিল ১০৩.৪১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ দেড় বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে নীতি সুদহার ছিল ৮ শতাংশের ঘরে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত তা ১০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ১৪-১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। সুদের হার বাড়ায় ব্যাবসায়িক ঋণের খরচ বেড়েছে, যা নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। এ সময় ৩২৭টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। কর্মহীন হয়েছে দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।
বিতর্কিত বিদেশি চুক্তি : ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় পোশাক রপ্তানিতে ট্যারিফ সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকে প্রায় ২১.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য (বোয়িং বিমান, এলএনজি, গম, তুলা) ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে হয়েছে। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে, যেখানে গ্যাসের দাম স্পট মার্কেটের চেয়ে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত বা স্বাক্ষরিত বিভিন্ন বাণিজ্যচুক্তি, বিশেষ করে শুল্কমুক্ত সুবিধা হ্রাস বা অসম শর্তের দরুন দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের চুক্তির ফলে বছরে এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকা পর্যন্ত আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মায়ানমারের রাখাইনে মালপত্র পাঠানোর অজুহাতে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মানবিক করিডর দেওয়ার পাঁয়তারা করা হলেও পরে তা বিতর্কের মুখে থেমে যায়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের কথা বললেও একজনও ফিরে যায়নি। বরং আরো অতিরিক্ত রোহিঙ্গা ঢুকেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫ মাসে আরো এক লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা দেশে ঢুকেছে।
বড় প্রকল্পে স্থবিরতা : সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৎ কেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার দিনক্ষণ পেছানো হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বেশ কয়েক মাস বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। এত দিনে অন্তত এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সাশ্রয় হতো।
শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা হয়নি। এতেও রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ের কাজ থামিয়ে রাখা হয়েছে। এ রকম আরো বহু প্রকল্প থমকে যায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন