গণতন্ত্রের জন্য সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল অত্যন্ত জরুরি

959
gb

ড. মীজানুর রহমান ||
গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে বিরোধী দল। সেখানে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল ভাগাভাগি কিংবা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য সুখবর নয়। নিকট অতীতে আগে বিএনপি থেকে শমশের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। শমশের মবিন চৌধুরী বিএনপির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময় থেকে তিনি বিএনপির পররাষ্ট্র বিষয়াবলি দেখতেন। এই শমশের মবিন চৌধুরীই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের বিদেশে অবস্থান করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যারা পাসপোর্ট ছাড়া লিবিয়া চলে গিয়েছিল, তাদের পাসপোর্ট এবং ডলার দেয়ার সব কাজ তিনিই করেছিলেন। এমন অনেক কাজই তিনি বিএনপির জন্য বহু আগে থেকে করে আসছিলেন। কাজেই ঐতিহাসিকভাবে শমশের মবিন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি।
শমশের মবিন বিএনপি নেতা তারেক জিয়ারও খুব প্রিয়জন ছিলেন। এ সম্পর্কের ফাটলের কারণেই হয়তো তিনি পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া লন্ডনে খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া যখন মুখোমুখি হন, তখন হতে পারে শমসের মুবিনের অবস্থান সম্পর্কে তাদের মধ্যে বিপরীত মতের সৃষ্টি হয়। তবে বিএনপিতে এমন অনেক ঘটনাই আরো ঘটবে। বিএনপিতে অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাই অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে অনেকের নাম অস্পষ্ট বা ভাসা ভাসাভাবে আসছে। এগুলো যদি কোনোভাবে তথ্য-প্রমাণের আলোকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে কেবল শমশের মবিন নয় আরো অনেকে পদত্যাগ করবেন এমনটিই আমার মনে হয়। বিএনপিতে অনেক বিবেকবান মানুষ আছেন। এসব ঘটনায় তারা যদি মনে করেন যে, আমরা বিবেক বন্ধন রেখে রাজনীতি করি না। কাজেই এমন বিবেকবানদের বিএনপিতে সংশ্লিষ্ট থাকার কোনো কারণ থাকবে না। বিএনপিতে আরো কিছু ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০১৩-১৪ সালে সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি, জামায়াতসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল এবং গুপ্ত গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা তো বিএনপিতে রয়েছেই। কিন্তু এসব বিষয়ে বিএনপির ভেতরের অবস্থান, ইস্যু এবং শীর্ষ নেতাদের মনোভাব সম্পর্কে যখন স্পষ্ট ধারণা আসবে, তখন মাঠের সাধারণ রাজনীতি এবং মানুষের মনোজগতেরও পরিবর্তন হবে। তাতে বিএনপির উচ্চ স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে পরিবর্তন আসবে না এমনটি মনে করার কারণ নেই। কাজেই তাদের নেতৃত্বের মধ্যেও পরিবর্তন আসবে। যখন নির্বাচন আসে, তখন নির্বাচনের বিষয়ে আমরা নিরপেক্ষ, নির্দলীয়সহ কিছু মুখস্থ বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা করি। কিন্তু এই নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার হলো রাজনৈতিক দল। কিন্তু এই রাজনৈতিক দলের নানা দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেই না। রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক পথে না আনতে পারলে বিদেশ থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। তখন এমন অবস্থা দাঁড়াবে কয়েকদিন এক পক্ষের সঙ্গে থাকবে পরে আরেক পক্ষে যাবে। এক সময় তারা বুঝবে তাদের অবস্থান ভুল ছিল। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নানা অঘটন বিশৃঙ্খলা ঘটতেই থাকবে। এক্ষেত্রে সরকারি দলেরও যেভাবে সংগঠিত হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে তা হচ্ছে না। সেখানে বিরোধী দলের অবস্থা আরো মারাত্মক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অবশ্যই একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই বিরোধী দলকেও হতে হবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। সব সময়ই বলি আমাদের সরকারি এবং বিরোধী দল দুটি হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং সেই চেতনায় বিশ্বাসী।
আমাদের দেশে বিরোধী দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হলে সরকারি দলের পক্ষে নীতি-নির্ধারণসহ অনেক বিষয় নির্ধারণ করতে সুবিধা হতো। যদি বিরোধী দল দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পররাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিষয়ে ভালো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং পরামর্শ দিত তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের ভীত আরো মজবুত হতো। আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা কতকগুলো টার্গেট নির্ধারণ করেছি যেমন মধ্যম আয়, উন্নত দেশ। এই লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আমরা একটি একটি ধাপ অতিক্রমও করছি। কিন্তু আমাদের রাজনীতি সেই গতিতে এগুচ্ছে না। এটিই হলো বড় সমস্যা। দেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে চলছে সেখানে রাজনৈতিক দলের অবস্থা যদি ছিন্নভিন্ন হয় তাহলে কোনো ভাবেই তা সুখকর হবে না। বলা হয় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির নিয়মিত মিটিং হয় না। গত বছর ব্রিটিশ একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, বিএনপির অবরোধ এখনো চলছে। আরো খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। বিএনপি ২০১৫ সালের জানুয়ারির প্রথমে যে অবরোধ দিয়েছিল তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেনি। এই অবরোধ তুলে নেয়ার মতো সময়টুকুও তাদের হয়নি। সেখানে বাকি বিষয়গুলো তো আরো পরের কথা। এখন অনেকেই জিজ্ঞাসা করলে বলা হয়, এই অবরোধ আর কার্যকর নেই এবং নানাভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়। কাজেই বলা যায়, আমরা এখনো অবরোধের মধ্যেই আছি। বিএনপির মতো রাজনৈতিক দল আস্তে আস্তে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে বিভিন্ন চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা। এসব ঘটনার প্রমাণও মিলছে।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের খুন করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা এবং গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে অথবা জনগণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং সমর্থন আদায়ের পরিবর্তে একটি গণতন্ত্রের জন্য সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল অত্যন্ত জরুরিসহিংস ধারা এখন অনুসরণ করা হচ্ছে। আমরা আশা করেছিলাম ২০১৪-১৫ সালের ব্যর্থ আন্দোলনের পরে বিএনপি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজনীতি করবে। কিন্তু তারা এখনো একই পথ অনুসরণ করছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা করার প্রচেষ্টায় উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত ছিল এই অভিযোগ রয়েছে। আরো অভিযোগ আছে যে, গত বছর বিদেশি হত্যাসহ নানা ঘটনায় একই চক্র জড়িত এবং তারা নানা যড়ষন্ত্র করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। কিন্তু সমস্য আরো গভীরে। ঢাকা মহানগরের রাজনীতি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির মহানগর কমিটি ছিল না। পরে কমিটি করে দেয়া হলো। কমিটি গঠনের দুই বছরের মধ্যে কোনো মিটিং হয়েছি কিনা আমার জানা নেই। সম্প্রতি তাদের জাতীয় সম্মেলন হলো। বিএনপির সহযোগী সর্বোচ্চ পর্যায়ে এক নেতা আমাকে জানিয়েছে, তার সঙ্গে গত ৯ মাসেও মহানগর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের কোনো যোগাযোগ হয়নি, অব দ্য রেকর্ডে তিনি আমাকে জানিয়েছেন। এই হলো বিএনপির অবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলো তৃণমূল থেকে কমিটি করে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যোগাযোগ হলে ভালো হতো। আমাদের এখানে রাজনীতিতে দ্বিমুখী যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। এই দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর চালু করতে হবে।
কেবল আওয়ামী লীগই সবলভাবে দাঁড়াক, বিএনপি নয় তা কখনো চাই না। দুই দলেরই অবস্থার উন্নতি হোক। তবে আওয়ামী লীগের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। কারণ এটি একটি ঐতিহাসিক দল। তবে তাদের আরো সুসংগঠিত হওয়া এবং কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে। তার পরও বলি বিরোধী দলে থাকার সময় আওয়ামী লীগের অবস্থা বিএনপির মতো খারাপ থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় দেখতাম ইলিয়াস গ্রুপ, পাগলা শহীদের গ্রুপের মধ্যে সারাদিন গোলাগুলি হতো এবং এক দল আরেক দলকে মারছে। তাই বলা যায়, বিএনপিতে সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ড ছিল। ক্যাম্পাসে এমন অবস্থা ছিল প্রায়ই গোলাগুলিতে মানুষ মারা যেত। এই প্রবণতা আস্তে আস্তে কমে আসছে। তবে এ রকম একটি ঘটনাও কোনো ক্রমেই কাম্য নয়।
রাজনীতি বলতে যদি হরতাল এবং মিছিল করে গাড়ি ভাঙচুর বোঝায়, তবে সে রাজনীতির কোনো দরকার নেই। আমাদের গঠনতান্ত্রিক এবং সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন রাজনীতি দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই সরকারি এবং বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলের সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করার স্বার্থ ও প্রয়োজনে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তেমনটি আমাদের রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে না।