গ্রন্থমেলায় পাঠক-ঝড়

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯

শিশুপ্রহরে শিশুদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস

65

সকালটা শিশুদের। দুপুরে একটু ছিমছাম ভাব। বিকালে মানুষের স্রোত। আর সন্ধ্যায় রীতিমতো পাঠকের ঝড়। এভাবেই কাটল অমর একুশে গ্রন্থমেলার দ্বিতীয় শুক্রবার। সকালে শিশুপ্রহরে শিশুরা আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মেতে ছিল দুপুর পর্যন্ত।

শিশুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে মেলায় এসেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।

বিকাল থেকে স্রোতের মতো বইপ্রেমীরা মেলায় আসতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, বই বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। সন্ধ্যার দিকে প্যাভিলিয়ন আর স্টলগুলোতে বিক্রয় কর্মীদের অবসর ছিল না মুহূর্তের জন্যেও।

প্রকাশকরা আশা করছেন, মেলায় এই পাঠক-ঝড় ও বইয়ের বিক্রি আজও অব্যাহত থাকবে। আজ শনিবারও বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় শিশুপ্রহর।

শুক্রবার মেলার দ্বার খুলে দেয়া হয় বেলা ১১টায়। শিশুপ্রহর থাকায় শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেতে ওঠে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশুচত্বর। নানা বয়সের শিশুরা সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি-শিকুদের সঙ্গে গানে গানে মেতে ওঠে। ওরা নানা বিষয়ের ওপর লেখা বইও কেনে। শিশুদের আনন্দের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন লেখকরাও।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার সকালে সস্ত্রীক মেলায় আসেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিসিমপুরের মঞ্চে শিশুদের সঙ্গে তিনি সময় কাটান। শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, খেলা করেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, সিসিমপুর দেখে যারা বড় হবে তারা যতদিন বাঁচবে তাদের হৃদয়ে মানুষের দরদ ও ভালোবাসা থাকবে। এই শিক্ষাই সিসিমপুর দেয়। সিসিমপুর শুধু টিভি অনুষ্ঠান নয়, সিসিমপুর একটি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও। এ সময় রবার্ট মিলার মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা আয়োজন দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

মেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, শিশু-কিশোরদের জন্য কার্টুন, রূপকথা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ মজার মজার সব বই নিয়ে হাজির হয়েছেন প্রকাশকরা। শুধু শিশুচত্বর নয়, শিশুদের জন্য আলাদা আয়োজন রয়েছে প্রতিটি প্রকাশনীর।

মেলায় এদিন পাঠকের জোয়ার থাকবে- এমনটা ধারণা করা হলেও সেটি যে পাঠকের ঝড়ে পরিণত হবে তা ভাবেননি অনেকেই। বিকালে প্রথমার প্যাভিলিয়নে একটার পর একটা বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছিলেন আনিসুল হক।

মেলা জমে উঠেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি প্রধান বিক্রয় কর্মীর কথা উল্লেখ করে বলেন, ওরা বলছে গতবারের তুলনায় এ সময়ে বিক্রি বেশি হচ্ছে। বাণিজ্য মেলা ও বিপিএল শেষ হচ্ছে আজ (শুক্রবার)। সেদিক থেকে মেলার আগামী সময় আরও ভালো হবে। তবে মাঝখানে গতিটা একটু কমবে।

লেখকের কথায় কিছুটা সংশয় থাকলেও সন্ধ্যা হতেই মেলায় যেন বইপ্রেমী পাঠকদের একটা ঝড় বয়ে গেল। এত মানুষ এলো যে মেলায় কার্যত তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। এমনকি মানুষের হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল। প্রায় সব স্টলে ক্রেতার সমাগম দেখা যায় এবং বই বিক্রিরও ধুম পড়ে।

মেলায় এদিন আসা আরও লেখকদের মধ্যে রয়েছেন প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, মোস্তফা কামাল, সুমন্ত আসলামসহ আরও অনেকে।

ছুটির বিকালে মেলায় এসেছে কবি-সাংবাদিক মুস্তাফিজ শফির দুটি কবিতার বই। কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে ‘ব্যক্তিগত রোদ এবং অন্যান্য’। তিনটি কবিতার ধারাবাহিক নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। চৈতন্য থেকে এসেছে তার ‘কবির বিষণ্ণ বান্ধবীরা’ বইটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ।

নতুন বই : শুক্রবার মেলায় এসেছে ২৬৩টি নতুন বই। এর মধ্যে রয়েছে- শাহবুদ্দিন আহমেদের ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’ (অন্যপ্রকাশ), আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘সেরা দশ গল্প’ (অন্যপ্রকাশ), জগদীশ চন্দ্র বসুর লেখা বাংলা ভাষার প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘পলাতক তুফান’, গোলাম কুদ্দুছের ‘ভাষা আন্দোন সহজ পাঠ’, যতীন সরকারের ‘সংস্কৃতি ভাবনা’ (ভাষা প্রকাশ), ইমদাদুল হক মিলনের ‘কলাপাতা ও লাল জবা ফুল’ (কথা প্রকাশ), মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘এক ডজন একজনে’ (সময়), আবুল হাসানের ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’ (কবি প্রকাশনী), সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘নির্বাচিত সহজিয়া কড়চা’ (পাঠক সমাবেশ), মোহিত কামালের ‘লুইপার কালসাপ’ (বিদ্যাপ্রকাশ), আনিসুজ্জামানের ‘স্মরণ ও বরণ’ (চন্দ্রবতী একাডেমি), ইন্দ্রজিৎ সরকারের ‘এইসব কাছে আসা’ (দেশ পাবলিকেশন্স), হাসান জাকীরের ‘দুহাতে ছড়ানো শূন্যতা’ (আবিষ্কার), খান চমন-ই-এলাহির ‘মেয়েটি বাংলাদেশ প্রজন্মের’ (শুদ্ধপ্রকাশ)।

মূলমঞ্চের আয়োজন : শুক্রবার মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেন : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল মনসুর। আলোচনায় অংশ নেন মতলুব আলী ও সৈয়দ আবুল মকসুদ। সভাপতিত্ব করেন রফিকুন নবী।

সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি অঞ্জনা সাহা এবং রনজু রাইম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মীর বরকত। সঞ্জয় রায়ের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন গীতিসত্র এবং ফারহানা চৌধুরীর পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা) শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনা করেন।

মন্তব্য
Loading...