সাম্প্রতিক যুদ্ধপ্রবণতা ও শুভচিন্তার শূন্যতা -এম এ আলীম সরকার

gbn

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুন সমস্যার মুখোমুখি করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বদলে গেছে। যেসব চিন্তা-ভাবনা রীতিনীতি সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির আগে পর্যন্ত মানবজাতির মধ্যে ছিল সেগুলাে কার্যকর হওয়ার নতুন নতুন চিন্তা-চেতনা গড়ে উঠছে না। এ এক সম্ভাবনাহীন বাস্তবতা।  মানুষের মধ্যে  পরিবর্তিত অবস্থায় যে নতুন চিন্তা দরকার তা দেখা যায়না। গত দুই-তিন দশক ধরে এ এক নতুন বাস্তবতা।সমাজ রাষ্ট্র বিশ্ব আজ  ভোগবিলাসের চিন্তা-চেতনায় মগ্ন আছে। সমাজের  সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সবাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিশ্বে জনগণের সর্বজনীন কল্যাণে  উন্নতিশীল চিন্তা কোনো রাষ্ট্রনায়ক করছে না। প্রত্যেক রাষ্ট্রনায়কদের মননজগতে শুভচিন্তার শূন্যতা রয়েছে। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর বিশ্বব্যাপী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য নেই। বিশ্ব এখন পশ্চিমা মার্কিন কর্তৃত্ববাদীদের একক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রনে চলে গেছে। পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮০ সাল থেকে যুদ্ধবাজ নীতি গ্রহণ করে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদীরা পানামার প্রেসিডেন্ট মানুয়েল রনিয়েগাকে অপহরণ,  মধ্যপ্রাচ্যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন , লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল- আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁদের তেল সম্পদ দখলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যার খেশারত দিতে হচ্ছে জনসাধারণকে এবং প্রত্যেক দেশেই গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে  গাজায় জাতি নিধনের জন্য ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়েছে। গাজায় প্রায় ২৫ মাসের  যুদ্ধে শিশু আবাল বৃদ্ধ বয়স্কসহ প্রায় এক লাখের বেশি লোক  বোমায় নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় দুই  লাখের বেশি এবং ৬০% বাস্তচ্যুত হয়েছে। গাজা উপত্যকা কার্যত ৯০% ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।  জাতিসংঘকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে  স্কুল, কলেজ, শরনার্থী ক্যাম্পে, এমনকি হাসপাতালেও নিরস্ত্র বেসামরিক লোককে বোমা হামলায় হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও  চলমান সময়েও আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি আইন লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রতিদিন বোমা হামলা করে গাজায় নিরস্ত্র মানুষ মারছে। পৃথিবীর কোনো আইনই তাদের কাছে আইন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রত্যক্ষ মদদে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করে। গাজায় বেসামরিক জনগণকে হত্যার কারণে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্চবিলাসী এবং  তাঁর উচ্চ আকাঙ্ক্ষা আছে। আমরা আশা করেছিলাম, ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার জন্য যুদ্ধবাজ নীতি পরিহার করে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে সেই পথেই হেঁটেছিলেন।  ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, গাজায়-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধেরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকমাস ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করে অল্প সময়ের মধ্যে গত শনিবার (৩ জানুয়ারি)  ভোর রাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস সহ কয়েকটি প্রদেশে মার্কিন সামরিক বাহিনী একযোগে বিমান হামলা চালিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে জোরপূর্বক অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় প্রায় ৮০ জন বেসামরিক লোকসহ নিহিত হয়েছে। এর মধ্যে কিউবান সামরিক বাহিনীর ৩২ জন সদস্য ছিলেন মাদুরোর নিরাপত্তার দায়িত্বে,  ৪ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।  মাদুরাে ও তাঁর স্ত্রীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে আটক এবং দেশ থেকে বের করার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক আইনের সম্পর্কে মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘ সংস্থার উদ্দেশ্য ও র্নীতির পরিপন্থী। ট্রাম্পের আগ্রাসনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত আগ্রাসন হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক  আগ্রাসনে তাদের কর্তৃত্ববাদীর আসল চরিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা এই আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং সেই সঙ্গে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী ফ্লোরেসের মুক্তির দাবি করছি। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরীর পিছনে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে । ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে খামেনি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে চলমান সময়ে অর্থনীতি অবস্থা  একেবারেই ভঙ্গুর। অতি সম্প্রতি ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়, যদিও বহু বছর ধরে পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন। তবে ইহাতে ইরানের সর্বত্র সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক হতাহত হয়েছে। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ পুনর্গঠন করে বিশ্ব রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী না রেখে বিশ্ব রাষ্ট্রসংঘের অধীনে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এখন সময় এসেছে,  ইঙ্গ-মার্কিন বিরোধী  রাশিয়া, চীন,  উত্তর কোরিয়া, ইরান ও ভারত সহ অন্যান্য সমমানের দেশ নিয়ে জোট গঠন না করলে বিশ্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। গাজার মত অনেক রাষ্ট্রে জাতি নিধন করার চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র। আরও অনেক দেশ মার্কিন কর্তৃকত্ববাদীদের আগ্রাসনের কবলে পড়বে। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে অনেক রাষ্ট্র বিলীন হয়ে যাবে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও কিউবাকে মাদক পাচারের  অভিযোগে ভেনেজুয়েলার মত পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয়। মাদক পাচারের অভিযোগে মাদুরো ও তাঁর  স্ত্রী ফ্লোরেসকে আটক করে  নিউইয়র্কের একটি কুখ্যাত কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং নিউইয়র্কের ম্যানহাটন আদালতে তাদের বিচারকার্য চলমান আছে। কোনো দেশ বিশ্বের বিচারক হতে পারে না এবং কোনো দেশের প্রেসিডেন্টের বিচারও করতে পারেনা। যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। মার্কিন কর্তৃত্ববাদ আগ্রাসন বিরোধী জোট গঠন করা এখন সময়ের দাবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতন অতি নিকট অপেক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করার জন্য বিশ্বব্যাপী সকল দেশের মজলুম জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অপশক্তি একদিন পরাজিত হবে এবং জয় হবে  শুভশক্তির। 
লেখকঃ এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন