জরুরি অবস্থা বিষয়ে ট্রাম্প

ছবি: রয়টার্স

65

বিশেষ প্রতিনিধি  যুক্তরাষ্ট্র  || 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যমে গতকাল মঙ্গলবার সব জল্পনাকল্পনার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—ওভাল অফিস থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমান্ত নিরাপত্তার অজুহাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বসেন কি না। সরকারি আইনজীবীরা এমন ঘোষণার আইনগত বিপত্তির কথা জানিয়ে ট্রাম্পকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, এমন কিছু করা হবে সম্পূর্ণ অশাসনতান্ত্রিক। কোনো কোনো রিপাবলিকান নেতাও এ ব্যাপারে তাঁদের অস্বস্তির কথা জানান।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তাঁর মিনিট দশেকের ভাষণে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যান। এই ভাষণের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যয় করেন অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক হারে মাদক প্রবেশের ফলে একদিকে দেশের নিরাপত্তা, অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় যে মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরতে।

 

প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প চলতি সংকটকে ‘হৃদয় ও আত্মার সংকট’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দেশের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর তাঁর প্রস্তাবিত দেয়াল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। দেয়াল নির্মাণ ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের দাবি পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের অনুরোধে তিনি ঢালাই সিমেন্টের দেয়ালের বদলে লোহার সীমান্তবেষ্টনী নির্মাণের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তিনি তাঁর দাবিমতো এই দেয়ালের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে ফেডারেল সরকার খুলে দিতে আহ্বান জানান।

ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই পাল্টা ভাষণে দুই ডেমোক্রেটিক নেতা, প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও সিনেটে ডেমোক্রেটিক নেতা সিনেটর চাক শুমার প্রেসিডেন্টের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে টানাহেঁচড়ার আগে সরকারি কাজকর্ম খুলে দিতে হবে। আট লাখ ফেডারেল কর্মচারীর বেতন আটকে আছে। এর ফলে সত্যি সত্যি এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ন্যান্সি পেলোসি বলেন, ট্রাম্প এক মনগড়া সংকট করে দেয়াল নির্মাণের জন্য অর্থ দাবি করে দেশের মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন।

মাত্র মিনিট দশেকের হলেও এই ভাষণে ট্রাম্প প্রায় এক ডজনের মতো অসত্য অথবা অর্ধসত্য দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থিত করেন। তাঁর ভাষণ শেষ হতে না হতেই অধিকাংশ টিভি নেটওয়ার্কে সে ভাষণের চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়। এনবিসি তাদের বিশ্লেষণে মোট ৯টি মিথ্যা ও অর্ধসত্য চিহ্নিত করে। তারা জানায়, অবৈধ অভিবাসন সংকটে রূপ নিয়েছে বলে ট্রাম্পের দাবি অতিরঞ্জিত। দেশে অধিকাংশ অবৈধ অভিবাসী দক্ষিণের সীমান্ত অতিক্রম করে আসে না। তাদের অধিকাংশই বৈধ ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে এবং আর ফিরে যায় না।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করেন, মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। এনবিসি জানায়, সরকারি তথ্য অনুসারে অধিকাংশ মাদকদ্রব্য গাড়িতে, ডাকযোগে অথবা নৌযানে প্রবেশ করছে।

অধিকাংশ পত্রপত্রিকাও ট্রাম্পের ভাষণ চলাকালে সমান্তরালভাবে তাঁর প্রদত্ত তথ্য যাচাই করে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শুধু ডেমোক্র্যাটদের জন্য ফেডারেল সরকার বন্ধ রয়েছে, ট্রাম্পের এই দাবি মিথ্যা। তারা সিমেন্টের বদলে লোহার বেড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে, ট্রাম্পের এই দাবিও মিথ্যা। ডেমোক্র্যাটরা সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রদানে সম্মত, কিন্তু দেয়াল নির্মাণে কোনো অর্থ বরাদ্দে প্রস্তুত নয়। তারা সরকারি কাজকর্ম খুলে দেওয়ার পর আলাদাভাবে দেয়ালের প্রশ্নে আলাপ-আলোচনার প্রস্তাব রেখেছে। নিউইয়র্ক টাইমস পাঠকদের মনে করিয়ে দেয়—এর আগে হোয়াইট হাউসে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, সরকারি কাজকর্ম বন্ধের দায়ভার তিনি গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন। এর জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করবেন না। পত্রিকাটি এক সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলে, বস্তুত এই মুহূর্তে সীমান্তে কোনো সংকট নেই। সংকট রয়েছে ওভাল অফিসে।

অধিকাংশ ভাষ্যকার একমত, এই ভাষণ ছিল দেশের মানুষের মতামত নিজের দিকে টানার জন্য ট্রাম্পের এক ‘জনসংযোগ প্রচারণা’। কিন্তু ট্রাম্প ও পেলোসি-শুমারের পাল্টাপাল্টি ভাষণে সরকার বন্ধের প্রশ্নে কারও মত বদলেছে বলে মনে হয় না। সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে ট্রাম্পের যুক্তি অনেকে সমর্থন করলেও দেয়াল নির্মাণের অজুহাতে সরকারি কাজকর্ম বন্ধ রাখার ব্যাপারে অধিকাংশ আমেরিকান অভিযোগের আঙুল ট্রাম্পের দিকেই তুলেছেন। সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুসারে, ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করে দোষ ট্রাম্পের। মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ সরকার বন্ধের জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেছে।

ট্রাম্প অবশ্য হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না। চাপ অব্যাহত রাখতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তিনি টেক্সাসের একটি সীমান্ত শহরে যাচ্ছেন সংকটের চিত্র দেখতে। এখানে অবস্থানকালে তিনি জরুরি অবস্থার বিষয়টি নতুন করে উত্থাপন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আজ বুধবার কংগ্রেসে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাবে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজকর্ম শুরুর লক্ষ্যে তাদের বাজেট বরাদ্দ মঞ্জুর করে প্রস্তাব গ্রহণ শুরু করবে। ভাবা হচ্ছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে পারে। অন্ততপক্ষে চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবে তাঁদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। নিজ দলের সদস্যদের দলছুট হওয়া ঠেকাতে ট্রাম্প আজ সন্ধ্যায় সিনেটে রিপাবলিকানদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিতে ক্যাপিটাল হিলে কংগ্রেস ভবনে যাচ্ছেন।

মন্তব্য
Loading...