বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র এআরটি চুক্তি: যা জানালো প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

gbn

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ (এআরটি) চুক্তির বিষয়বস্তু ও বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

প্রেস উইং জানায়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পারস্পরিক শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ (আরটি) আরোপ করেন। এর পরপরই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হলেও চূড়ান্ত দরকষাকষির মাধ্যমে তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এনবিআর, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

চুক্তির আওতাভুক্ত বিষয়

চুক্তিতে শুধু শুল্ক নয়; পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আগে থেকেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস (মেধাস্বত্ব অধিকার–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি) চুক্তির অনুস্বাক্ষরকারী। এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ শুল্ক চুক্তিতে নতুন কোনো অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হয়নি; বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের বিশেষ সুবিধা

চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম সুতা আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে ‘শূন্য শুল্ক’ বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক, যার ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর হবে না—যদি কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয়।

রপ্তানি বাজার সুরক্ষার স্বার্থে উৎস পরিবর্তনের মাধ্যমে এ আমদানির অঙ্গীকার করা হয়েছে বলে জানানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা নেই।

শুল্কমুক্ত সুবিধা

চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ২,৫০০টি পণ্য শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য ৭,১৩২টি ট্যারিফ লাইন/এইচএস কোড অফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর মধ্যে—

৪,৯২২টি ট্যারিফ লাইনে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর হবে (এর মধ্যে ৪৪১টি আগেই শূন্য শুল্ক ছিল);

১,৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো হবে (প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ হ্রাস, পরবর্তী চার বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ সমান হারে); এবং

৬৭২টি ট্যারিফ লাইনে ১০ বছরের মধ্যে শুল্ক শূন্য করা হবে (প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ হ্রাস, পরবর্তী নয় বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ সমান হারে)।

তবে ৩২৬টি ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান না থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল বাণিজ্য

চুক্তিতে পেপারলেস ট্রেড, মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) প্রয়োগ জোরদার এবং ই-কমার্সে স্থায়ী মরাটোরিয়াম সমর্থনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি মেধাস্বত্বসংক্রান্ত নয়টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবে বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে তাদের এফডিএ সনদের ভিত্তিতে পূর্বানুমতি ছাড়াই বাজার অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কৃষিপণ্য, দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রি আমদানিতে মার্কিন সনদ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক এসপিএস ব্যবস্থা স্বীকৃতির কথাও বলা হয়েছে। উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার অঙ্গীকার রয়েছে।

বিমা, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা উদারীকরণ, দুর্নীতিবিরোধী বিধান প্রয়োগ এবং ডব্লিউটিও–এর মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি গ্রহণের বিষয়গুলোও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম মান অনুযায়ী শ্রম আইন হালনাগাদ এবং পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সিবিপিআর, পিআরপি ও পিডিপিও স্বীকৃতির পাশাপাশি বোয়িং উড়োজাহাজ, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টার বিষয়গুলো খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মালয়েশিয়া বা কম্বোডিয়ার মতো চুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য বিষয়ে মার্কিন পরামর্শের যে শর্ত ছিল, বাংলাদেশের চুক্তিতে তা নেই।

রুলস অব অরিজিন ও এক্সিট ক্লজ

রুলস অব অরিজিনে নির্দিষ্ট ভ্যালু অ্যাডিশনের পরিমাণ উল্লেখ না থাকায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া তুলনামূলক সহজ হবে।

চুক্তির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘এক্সিট ক্লজ’ সংযোজন। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে চুক্তি বাতিলের সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশের অনুরোধে এতে চুক্তি বাতিলের একটি ধারা রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শুধু বজায় থাকবে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন