একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামীলীগের হ্যাটট্রিক ও বিএনপির শোচনীয় পরাজয়ের নেপথ্যে কারণগুলো

120

মতিয়ার চৌধুরী ||

কয়েকটি বিচ্ছিহ্ন ঘটনা ছাড়া মোটামোটি শান্তিপূর্নভাবে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনে বিপুল সংখ্যক দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে শেষ হয়েছে বহুল প্রতিক্ষিত এই নির্বাচন। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারনে একটি আসন এবং অন্য একটি আসনে গোলযোগের জন্যে ভোট গ্রহন স্থগিত করা হয়। যদিও অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ রয়েছে তার পরেও অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এই নির্বাচন সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয়েছে। ২০০৮, এবং ২০১৫ এর তুলনায় এবারের নির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানি হয়েছে কম। তার পরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটাভোটিকে কেন্দ্র করে ১৩জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও ঐক্যফন্টের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে তারাই হামলার শিকার হয়েছেন বেশী এখানে দেখা গেছে নির্বাচনী সহিংসতায় ১১জনই মারা গেছেন মহাজোটের।
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে ৯৬% আসনে বিজয়ী হয়েছেন মহাজোটের প্রার্থীরা। বাকী ৪% পেয়েছেন ঐক্যফন্ট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোটে জয়লাভ এবং অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফন্টের বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে আজকের এই আলোচনা।
নির্বাচন শেষে দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষক এবং কুটনীতিকরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন নির্বাচন সুষ্ট এবং শান্তিপূর্নভাবে হয়েছে । তারা তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছেন অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এই নির্বাচন স্বচ্ছ এবং সুষ্টুভাবে সম্পœ হয়েছে, তারা কারচুচির অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক গুলোও এই নির্বাচনে কোন ধরনের কারচুচির সংবাদ প্রকাশ করেনি বরং মহাজোটের এই বিজয়কে উন্নয়নের বিজয় এবং হ্যাটট্রিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দৈনিক যুগান্তর ব্যানার হেডিং করেছে আওয়ামীরীগের হ্যাটট্রিক জয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম ছিল ইতিহাস গড়লেন শেখ হাসিনা, বিভিন্ন সময়ে সরকারের সমালোচনাকারী পত্রিকা দৈনিক সমকালও আওয়ামীলীগের হ্যাটট্রিক শিরোনামে ব্যানার হ্যাডিং নিউজ করেছে, দৈনিক জনকণ্ট লিখেছে আবারও শেখ হাসিনা। ছাড়া বিশ্বনেতৃবৃন্দ এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয়কে উন্নয়নের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সুষ্টু ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এপর্যন্ত যেসব দেশ ও সরকার প্রধান অভিনন্দন জানিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের প্রধানমনস্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী জাপান, সৌদিআরব, ভ‚টান, নেপাল, শ্রীলংকা সহ বিশো¦র ৫১টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান। এছাড়া আরো অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের মুখ্যমন্ত্রীরা। প্রতিটি দেশ এবং সরকার প্রধানরা বাংলাদেশকে তাদের সহযোগীতার কথা পূনব্যাক্ত করেছেন এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায়ায় পাশে থাকার অঙ্গিকার করেছেন। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বেজিপির সেক্রেটরী সহ চীনের কমিউনিষ্ট পার্টি ও অভিনন্দন জানিয়েছে।
এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ পেয়েছে ২৫৯টি আসন জাতীয় পার্টি-২০, জাসদ-২, ওয়ার্কার্স পার্টি-৩, জাতীয় পার্টি মঞ্জু-১. তরিকত ফেডারেশন-১, বিকল্পধারা-২, স্বতন্ত্র-৩, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের বিএনপি-৫ এবং গণফেরাম-২। বিএনপি‘র প্রাপ্ত আসন গুলো হচ্ছে বগুড়া-৪ আসনে মোর্শারফ হোসেন, বগুড়া–৬ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,ঠাকুর গাঁও-৩ জাহেদুর রহমান, চাপাই নবাগঞ্জ দুটিতে আমিনুল ইসলাম ও হারুনুর রশিদ। অন্যদিকে তাদের জোটের মৌলভীবাজার-২ থেকে গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও সিলেট ২ থেকে গণফোরামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী মোকাব্বির খান। ভোটের হিসেব করলে যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সেখানে তাদের ভোট বাড়েনি বরং কমেছে। যদিও তারা এসব আসনে বিজয়ী হয়েছেন। গণফোরামের প্রার্থীদের বিজয়ের পেছনে রয়েছে অন্য কারন, সুতান মোহাম্মদ মনসুর তার ব্যক্তিগত ইমেজে মৌলভীবাজার ২ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন, আর সিলেট ২ আসনে মোকাব্বির খানের বিজয়ের পেছনে রয়েছে নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও পুত্রের অবদান এবং আবেগ। কেননা এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি এহিয়া চৌধুরীর পক্ষে মহাজোটের কেউ কাজ করেননি, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দু‘জনই ছিলেন আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী। অন্যদিকে ভোটের ঠিক পূর্বের রাতে খেলাফত মজলিশ প্রার্থী মোকাব্বির খানকে সমর্থন জানায়, ভোটে কারচুপি হলে কারো পক্ষেই পাশ করা সম্ভব হতোনা। প্রতিটি আসনেই নির্বাচন হয়েছে কোন ধরনের ঝামেলা ছাড়া অবাদ এবং সুষ্টুভাবে।
আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই সেখানে দেখা যাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পেছেছিল মাত্র ৩০টি আসন, আর ২০১৪ সালে দলটি নির্বাচন বর্জন করে দেশব্যাপী বাসে ট্রেনে আগুন, হত্যা, হামলা, সরকারী সম্পদের ক্ষতি সাধন করার ্ তাদের প্রতি সাধানর মানুষের আস্থা কমেছে।
বিএনপি-জোটের পরাজয়ের নেপথ্যে কারণ সমূহঃ
এছাড়া বিএনপির শোচনীয় ভাবে পরাজয়ের অন্যতম কারন গুলির মধ্যে রয়েছে দলে অনৈক্য, সঠিক প্রচার প্রচারণার অভাব, বিজয়ী হলে কে হবেন দলনেতা ড. কামাল হোসেন না তারেক রহমান এমনটি পরিস্কার ছিলনা, দলের ভেতর তারেক রহমানের একক প্রভাব, দেশে নেতারা কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও লন্ডনে পলাতক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার নিজ সিদ্ধান্তকেই প্রাধান্য দিয়েছেন কারো মতামতকে তিনি প্রাধান্য নেদননি, দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে ত্রæটি, সঠিক এবং ত্যাগী নেতারা অনেকেই মনোনয়ন বি ত হয়েছেন, আর একারনে দলের ত্যাগীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে দলত্যাগ করেছেন যেমন শমসের মোবেন চৌধুরী বা সিলেট-১ আসন থেকে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয় এনাম আহমদ চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত তাকে বাদ দিয়ে এই আসনে মনোনয়ন দেয়া হয় খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরকে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা দলের জন্যে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে পরিচিত এনাম আহমদ চৌধুরী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ঠিক আগমূহুর্থে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। রয়েছে মনোনময় বানিজ্যেরও অভিযোগও, মনোনয়েন বানিজ্যের কারনে প্রকৃত ত্যাগীরা মনোনয়ন বি ত হয়েছেন, এনিয়ে বাংলাদেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেলে তারেক রহমানের মিলিয়ন পাউন্ডের বাড়ী ক্রয় ইত্যাদি সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাধারন কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন, এছাড়া প্রতিটি আসনে বিএনপি ৩/৪জন করে দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়েন দিলেও কে হবেন বিএনপি বা ধানের শীষের প্রার্থী নির্বাচনের আগেও তা পরিস্কার করা হয়নি শেষ মূহুর্থে যাদের চ‚ড়ান্ত করা হয় তাদের প্রতি অন্যরা আস্থা রাখতে পারেননি, শেষ পর্যন্ত এসব বি ত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ভোট দানে বিরত থাকেন। কোন কোন আসনে ঐক্যজোটের প্রার্থীদের ছাড়দেয়াও অন্যতম কারন। স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামাতপ্রীতি- জামাতের সঙ্গ ত্যাগ না করা বিএনপির পরাজয়ের প্রধান কারন, দলের ভেতর হাজার হাজার কর্মী সমর্থক রয়েছেন যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন জামাতের সঙ্গ ত্যাগ না করায় তাদের বিড়াট একটি অংশ ভোটদানে বিরত থাকেন। এছাড়া নির্বাচনের ঠিক দুদিন আগে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমে ঐক্যফেন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের একটি সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়, এই সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছেন জামাতকে জোটে রাখা হবে এসনটি জানলে বিএনপির সাথে ঐক্যে আসতেননা, এ্ই সাক্ষাৎকারটিও তাদের জন্যে বেশ ক্ষতির কারন হয়। এছাড়া দেশের স্ধাারন মানুষের মাঝে এমন একটি ধারনা রয়েছে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসলে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটবে, স্বাধীনতা বিরোধী জামাত আবার রাজনীতিতে পূনর্বাসিত হবে, দেশের চলমান উন্নয়ন ব্যাহত হবে ইত্যাদি বিষয়গুলোই তাদের পরাজয়ের কারণ।
অন্যদিকে মহাজোটের বিজয়ের অন্যতম কারন গুলির মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান উন্নয়ন যেমন পদ্মাসেতু বা মেট্ররেলের মতো মেঘাপ্রকল্প সমূহ, জঙ্গিদমন, মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, মাথা পিছু আয়বৃদ্ধি, ডিজিটাল বাংলাদেশ বা তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, নারীর ক্ষমতায়ান সহ সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প যা সাধারন মানুষকে প্রভাবিত করেছে। সেই সাথে নির্বাচনের কয়েকমাস আগ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের পক্ষে তারকাদের প্রচারনা। সরকারের উন্নয়নমুখী কার্যক্রমের বিভিন্ন দিকগুলো দল বেধে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে প্রচার করেছেন সঙ্গীত শিল্পি, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ফুটবল ক্রিকেট তারকা সহ দেশের দেশের বিশিষ্টজনেরা এসব ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। এছাড়া বিএনপি বা তার মিত্ররা মুখে ধর্মের কথা বললেও ইসলামের জন্যে কেউ কিছু করেনি, শেখ হাসিনার সরকার প্রতিটি উপজেলায় সরকারী খরছে একটি মসজিদ সহ ঈমাম-মোয়াজ্জিনদের বেতন ভাতার সুবিধা এবং মাদ্রসা শিক্ষার স্বীকৃতি প্রদান করা সহ একটি জনগোষ্টিীকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসায় এই অবহেলিত কউমীওয়ালাদের সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে সাধারন মানুষের মনে ভয় ছিল বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে যেমনটি বিএনপি অতীতে করেনছিন যেনন আওয়ামীলীগ সরকার গ্রামে গঞ্জে চালু করেছিল কমিউনিটি ক্লিনিক, বিএনপি ক্ষতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়, শুধু কমিউনিটি ক্লিনিকই নয় উপজেলা পদ্দতিও বাতিল করেছিল বিএনপি সরকার সেইসব অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও দেশের সাধারন ভোটারা বিএনপিকে প্রত্যাখান করেছে। আজ বা আগামী কালের মধ্যেই সরকারী ভাবে চ‚ড়ান্ত বিজয়ীদে গ্যাজেট প্রকাশ করা হবে সাথে সাথে প্রার্থীরা শপথ গ্রহনের পরপরই নতুন সরকার গঠন করা হবে। আওয়ামীলেিগর নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সামনে সবচেয়ে কঠিন সময় আসছে চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা, সেই সাথে যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরও উচিত হবে ভ‚ল শুধরে নেয়া এবং দেশের স্বার্থে কাজ করা, দলমত যাই থাকুক সবার উর্ধে দেশ।

মন্তব্য
Loading...