১৬ সালে বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে জঙ্গিবাদ

429
gb

 

২০১৬ সালে বাংলাদেশে সম্ভবত: সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ।

কয়েক বছরের বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার পর এবছরই বাংলাদেশে চালানো হয় বাংলাদেশে এযাবতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা- গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে।

সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে ভীতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা সারাবছরই গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে বারবার উঠে এসেছে।

গুলশান হামলা: বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

অনেকটা নি:সন্দেহেই বলা যায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশকে সবচেয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে যেই ঘটনা, সেটি গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা। পয়লা জুলাইয়ে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সেই হামলা সারা বিশ্বের নজর ঘুরিয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের দিকে।

সেই হামলার আকস্মিকতা সাংবাদিক, নিরাপত্তা বাহিনী, সাধারণ মানুষসহ সবাইকেই অনেকটা হতবিহ্বল করে দিয়েছিল।

পরদিন সকালে সেনা অভিযানের মধ্য দিয়ে যখন ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটে তার আগেই সেখানে মারা গিয়েছেন ১৭ জন বিদেশীসহ ২২ জন বেসামরিক নাগরিক, দুজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং অভিযানে নিহত হয় ৫ জন হামলাকারী।

বছর-বছর বেড়েছে হামলার পরিমাণ

যদিও গুলশান হামলাটি ছিল জঙ্গি হামলার চরম রূপ, কিন্তু জঙ্গি হামলার শঙ্কা ছিল শুরু থেকেই।

প্রায় তিন বছর চলতে থাকা বিচ্ছিন্নভাবে গুপ্তহত্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে ২০১৫ সালে। জঙ্গিদের গুপ্তহত্যার শিকার হন ৫ জন লেখক-ব্লগার-পুলিশ-বিদেশীসহ অন্তত ১৩ জন।

“এমনভাবে টার্গেটগুলো সিলেক্ট করছিলো তারা যাতে পাবলিক রিঅ্যাকশনগুলো বিভক্ত থাকে। যেই প্যাটার্নটা আমরা দেখলাম তাতে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নব্য উত্থানের একটি ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু সেই ইঙ্গিতগুলো আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেইভাবে রিড করে নাই। বিচ্ছিন্ন মামলা হিসেবে নিতে নিতে পুরো প্যাটার্নটাই তারা মিস করেছিল”। লেখক-ব্লগার হত্যার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার হোসেন।

যদিও পুলিশ এবিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছে।

“এসব ঘটনার আসামী কিন্তু গতবছরও ধরা পড়েছে, আবার এবছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেও ধরা পড়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কারণে এইদেশেও যেমন জঙ্গিরা অনুপ্রেরণা পেয়েছে, তেমনি আমাদের তৎপরতাও চলেছে। কিন্তু তৎপরতাতো সবসময় একভাবে দেখা যায় না বা সবসময় দেখানোও যায় না”। ২০১৫ সালে বা এর আগে গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলোতে পুলিশ গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছিল জানিয়ে বলেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

২০১৬ সালে গুপ্তহত্যার ধারাবাহিকতা

২০১৬ সালের প্রথম হামলাটি হয় ফেব্রুয়ারিতে। পঞ্চগড়ে একজন হিন্দু পুরোহিত, যগেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

এরপর আবার লেখক-ব্লগার হত্যাকাণ্ড শুরু হয় এপ্রিলে।

এপ্রিলের ৭ তারিখ হত্যা করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদকে। তার হত্যার দায় স্বীকার করে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা বলে পরিচিত আনসার আল ইসলাম।

এই এপ্রিলেই একে একে ঘটে আরো তিনটি হত্যাকাণ্ড।

২৩শে এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

এর দুদিন পর ঢাকায় দিনেরবেলা ঘরে ঢুকে হত্যা করা হয় সমকামী বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক জুলহাস মান্নান এবং তার সঙ্গী মাহবুব তনয়কে।

জুলহাস মান্নান হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে বড় সাড়া তৈরি করায় এবং তার প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সমর্থন থাকায় এই বিষয়টিকে নিয়ে সরকার আর ‘ডিনায়াল মুডে’ যেতে পারেনি বলে মনে করছেন সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, এর আগে এই হামলাগুলোর সাথে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের আদর্শগত মিল সেটি অস্বীকার করার একটি চেষ্টা ছিল এবং একসময় এটিকে রাজনৈতিক রং দেয়ারও চেষ্টা হচ্ছিল।

জঙ্গিবাদের দুই ধারা

বাংলাদেশে জঙ্গিদের মূলত: দুটি ধারা হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছিল।

জুলহাস মান্নান এবং এর আগে লেখক-ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল একটি জঙ্গিদল আনসার আল ইসলাম, যা একসময় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামেও পরিচিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই দলটি জঙ্গিগোষ্ঠি আল-কায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত।

মনিরুল ইসলাম বলেন, জুলহাস মান্নান এবং মাহবুব তনয়ের হত্যাই ছিল এই গোষ্ঠিটির শেষ গুপ্তহত্যা।

মে এবং জুন মাসে বান্দরবনে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা, নাটোরে একজন খ্রিস্টান ব্যবসায়ীকে হত্যা এবং ঝিনাইদহে একজন হিন্দু পুরোহিতকে প্রায় একইভাবে গলা কেটে বা কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশের মতে এধরণের হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল জঙ্গিদের অপর ধারা, যেটিকে পরে নব্য জেএমবি বলে চিহ্নিত করে পুলিশ এবং এই গোষ্ঠিটি তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের আদর্শে অনুপ্রাণিত বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন।

পুলিশের মতে, এর কিছুদিন পর গুলশানে হামলাটি চালিয়েছিলো এই নব্য জেএমবি গোষ্ঠিই।

পরবর্তীতে এসব সকল ঘটনার দায় স্বীকার করে আইএসের কথিত সংবাদ সংস্থা আমাক।

গুলশান হামলার প্রভাব

প্রায় চার বছর চলতে থাকা এসব গুপ্তহত্যার মাঝেই আসে ২০১৬ সালের পয়লা জুলাই। গুলশানের হোলি আর্টিজানে হামলা হয় সেদিন সন্ধ্যা থেকে।

হোলি আর্টিজানের হামলা সারা বাংলাদেশের জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এটি কত বড় ধাক্কা ছিল?

“আমাদের বিশ্লেষণে এধরণের একটি প্রেডিকশন ছিল। নির্দিষ্টভাবে এই রেস্টুরেন্টে এমন একটি ঘটনা ঘটবে সেটা আমরা চিন্তা করিনি। কিন্তু এধরণের একটি ঘটনা তারা ঘটানোর চেষ্টা করছে এটা আমাদের জানা ছিল এবং সেজন্যে আমরা প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম”- বলেন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম।

আশঙ্কা যে ছিল সেটি বলছেন বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেনও। তার মতে, গুলশান হামলার ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সম্পর্কে ধারণায় একটি বড় পরিবর্তন আনে।

“এই ঘটনা কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনেক পরিবর্তন করে দিয়েছে। সরকারের আর ডিনায়ালের জায়গা থাকলো না। যদিও সরকার তখনো নানান ধরণের কথা বলেছিলো। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো যেমন তামিম চৌধুরী এবং তথাকথিত জঙ্গিদের হত্যা, এর ফলে চিত্রটা সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিলো যে বাংলাদেশে আইএসের আদর্শগত অস্তিত্ব বেশ শক্তভাবেই গ্রথিত হওয়ার পথে রয়েছে”

এর কয়েকদিন পর ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে আরেকটি হামলার চেষ্টা করা হয়। যদিও পুলিশের বাধার মুখে হামলাকারীরা ঈদগাহ পর্যন্ত যেতে পারেনি।

শোলাকিয়া হামলা এবং গুলশানে হামলাকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিত্তশালী পরিবারের ছেলে জড়িত থাকার তথ্য বের হবার পর জানা যায় যে বেশ কিছু তরুণ গত কয়েক বছর নিখোঁজ হয়েছে যাদের কেউ কেউ এধরণের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত।

যদিও এর আগেও ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার নজির দেখা গেছে, তবে গুলশান হামলার পর এনিয়ে সবাইকে নড়েচড়ে বসতে দেখা যায়।

জঙ্গিবাদে মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত বলে এই বিষয়টিকে অনেকটা অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল বলে মনে করেন মি. হোসেন। তার মতে, জঙ্গিবাদে জড়িত হয়ে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের একসাথে মিলিত হওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জঙ্গিবিরোধী অভিযান

গুলশান হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি অভিযান চালায় এবং এসব অভিযানে বেশ কিছু জঙ্গি সদস্য নিহতও হয়।

জুলাইয়ের ২৫ তারিখেই কল্যাণপুরে এক অভিযান চালায় পুলিশ এবং সেখানে ৯ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে জানায়।

যদিও পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলছেন, গুলশান হামলার কারণেই তারা তৎপর হয়েছেন এমনটা নয়।

“বছরের শুরু থেকে আমরা একটু একটু করে তথ্য জমাতে জমাতে সর্বশেষ এসে এই অপারেশনটা করতে সক্ষম হয়েছি। এটা আসলে গুলশান ঘটনার আগেও হতে পারতো। গুলশান ঘটনার আগে থেকেই আমরা এইসমস্ত জায়গাগুলোতে অভিযান করছি”।

এরপর তিন মাস যাবত অভিযানের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে মারা যায় নব্য জেএমবির বাংলাদেশ প্রধান বলে চিহ্নিত তামিম চৌধুরী।

এছাড়াও অভিযান চলে গাজীপুরে এবং ঢাকার আজিমপুরসহ বেশ কিছু জায়গায়। এসব অভিযানের ফলে কতটা কমেছে জঙ্গিগোষ্ঠির ক্ষমতা?

“এর কিছু প্রভাবতো থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জায়গায় যেটা কোন কনফ্লিক্ট জোন নয়, সাধারণ মানুষ এগুলোতে সমর্থন করে না। এসব অভিযানে বাকিরা যারা ছিলো তারা এক জায়গায় আর থাকতে পারছে না। সংগঠন যেটা গড়ে উঠেছিলো সেটা বিঘ্নিত হয়েছে”- বলেন সাখাওয়াত হোসেন।

মনিরুল ইসলাম বলছেন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর এখন বড় ধরণের কোন হামলা চালানোর মত সক্ষমতা বা লোকবল নেই।

“এই মুহূর্তে তারা যদি নতুন করে সংগঠিত হতে না পারে, নতুন করে প্রশিক্ষিত লোক তৈরি করতে না পারে বা তারা যদি অস্ত্র চোরাই পথে এনে নতুন লোকদের প্রশিক্ষণ না দিতে পারে তাহলে বড় ধরণের কোন হামলা করার সক্ষমতা তাদের এখন নাই”

একইসাথে তরুণদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন মি. ইসলাম।

তিনি বলেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া অনেকেই তাদের জানিয়েছে যে তাদেরকে ভুল বোঝানো হয়েছিল। তাদেরকে বলা হয়েছিলো তাদের এসব কাজ দেশের ৯০ ভাগ লোক সমর্থন করে। কিন্তু যখন দেখা গেলো যে জঙ্গি হামলার পর হামলাকারীদের লাশ তাদের বাবা-মাও গ্রহণ করছে না এবং তাদেরকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করছে না এটা তাদেরকে একটা বড় ধাক্কা দিয়েছে।

২০১৭: কি হতে পারে?

বর্তমানে বড় হামলার সক্ষমতা না থাকলেও জঙ্গি সংগঠনগুলো নতুন করে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে পুলিশ।

এদিকে যদিও জঙ্গি দমনে সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন বেশ তৎপর রয়েছে বলে মনে করছেন সাখাওয়াত হোসেন।

তবে এটি যে কোন সময়ে বাড়ার আশঙ্কাও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

“একই কাঠামোতে তারা হয়তো নেই। একসময় তারা দলবদ্ধভাবে কাজ করেছে, তারপর আসলো স্লিপার সেলে। স্লিপার সেল থেকে আবার সংগঠিতভাবে তারা হোলি আর্টিজানে হামলা করলো। অর্গানাইজেশন যে আগের অর্গানাইজেশন আছে তা নয়। এবং সন্ত্রাসবাদ বা ইন্সার্জেন্সির বিষয়গুলো একটা চক্রাকার উপায়ে কমে-বাড়ে। এটা তারাও জানে”।

মি. হোসেন বলছেন, জঙ্গিবাদের বিস্তার রোধে যে একটি সার্বিক উদ্যোগ দরকার সেদিকেও নজর দিতে হবে।

অন্যদিকে সবাই এবিষয়েও একমত যে, জঙ্গিবাদের সমস্যা শুধুমাত্র বাংলাদেশের অবস্থার ওপরেই নির্ভর করবে না।

বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোরও মূল অনুপ্রেরণাও হচ্ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ।

আইএস বা আল-কায়েদার মতো সংগঠনগুলোর শক্তি যতটা হ্রাস পাবে, এখানে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর জন্যও নতুন সদস্য সংগ্রহ করা বা তাদের কর্মীদের অনুপ্রাণিত করাটা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্র: বিবিসি।