২৫ মার্চ : গণহত্যার কালরাত্রি

649
gb

জিবিনিউজ ডেস্ক:: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, বেলা ১১টা। রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেইন রাজা। ঠিক তখনই বেজে উঠল তার সবুজ টেলিফোন। অপরপ্রান্ত থেকে নির্দেশ দিলেন পাকিস্তানের প্রধান সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, ‘খাদিম’ আজ রাতেই। অশান্ত-উদ্বেল দিন শেষে সন্ধ্যা নামল পূর্ব পাকিস্তানে। গভীর হলো রাত। সরকারি ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ হলো বেতার প্রচার। নিঃশব্দ অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়ল ঢাকা। ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা। রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে রিকয়েললেস রাইফেল, মেশিনগান ও মর্টার। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর।

রাতভর চলল বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ, ধ্বংসের তাণ্ডব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হতচকিত বাঙালি ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। দানবীয় বাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকায় নিমজ্জিত হলো ঢাকা। কেঁদে উঠল শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাত, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস। মানুষের কান্নায় ভারি হলো আকাশ। চারদিকে তখন কেবল আগুনের পিন্ড, ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের মর্মন্তুদ চিৎকার। মধ্যরাতেই ঢাকা পরিণত হলো লাশের শহরে। রচনা হলো পৃথিবীর এক জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার ইতিহাস।

আজ সেই ভয়াল ২৫ মার্চ গণহত্যার কালরাত। বাঙালি গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নিয়ে ১৯৭১ সালের এ রাতেই বাঙালি নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। মাত্র এক রাতে কেবল ঢাকা শহরেই নির্মমভাবে হত্যা করে অন্তত ৫০ হাজার ঘুমন্ত মানুষ। হত্যাযজ্ঞ চালায় গোটা পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের বুকে নেমে আসে পাকিস্তানের বর্বর সেনাদের অত্যাচার, উৎপীড়ন, পাশবিকতা ও হিংস্রতার থাবা। সে নিধনযজ্ঞ চলে মুক্তিযুদ্ধের টানা নয় মাস। তাতে যোগ দেয় তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতৃত্বাধীন এদেশীয় দোসর ঘাতক দালাল, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। পর দিন ২৬ মার্চ চোখে পোড়ো শহর নিয়ে ঘুম ভাঙল মানুষের। স্বজনের লাশ আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জেগে উঠল দেশ। শুরু হলো বাঙালির প্রতিরোধের পালা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় শুরু হয় বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। জোট বাঁধে জনতা। শুরু হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। অবশেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় প্রথম খোলে নরকের দরজা। জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয় পাকিস্তানি সেনারা। ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। মানুষরূপী ক্ষুধার্ত শকুনিরা সে রাতে শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বাবার সামনে মেয়েকে, ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করেছে, হত্যা করেছে। কাউকে কাউকে বাঁচিয়ে রেখেছিল নিহতদের কবর খুঁড়তে, স্বজনের লাশ টানতে। মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাদের বাধ্য করেছিল নিজের হাতে খোঁড়া কবরে মাটি চাপা দিতে প্রিয় স্বজনের লাশ। তারপরও শেষরক্ষা হয়নি। কাজ শেষে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে তাদেরও। চলার পথে রাস্তার দুপাশে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে অসংখ্য নিরীহ-দরিদ্র মানুষকে। মেডিক্যাল কলেজ ও ছাত্রাবাসে গোলার পর গোলা ছুড়ে চালাল বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। চারদিক রক্ত আর রক্ত, সারি সারি শহীদের লাশ।

প্রথমেই রাজারবাগ পুলিশ বাহিনী ও পিলখানার বাঙালি ইপিআরদের নিরস্ত্র করে পাক সেনারা। তারপর এগোতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে। তখন বিদেশি সাংবাদিকরা ছিলেন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে (বর্তমানে রূপসী বাংলা হোটেল)। হোটেলের ১২ তলায় দেহরক্ষীদের কড়া পাহারায় ঘুমাচ্ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। রাত পৌনে ১২টায় সেনারা ঘিরে ফেলে হোটেল। কেউ বেরুলেই নির্দেশ দেওয়া হয় গুলির। ততক্ষণে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ঢাকা। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কেবলই বাজছে পাক সেনাদের ট্যাঙ্ক ও মেশিনগান থেকে গুলির শব্দ, মানুষের গগনবিদারী কান্না। মধ্যরাতে ট্যাঙ্কগুলো নল উঁচিয়ে ঢুকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সঙ্গে সেনা বোঝাই লরি। হিংস্র শ্বাপদ পাক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা মেলেনি রোকেয়া হলের ছাত্রীদেরও। সম্ভ্রম বাঁচাতে হলের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়েছিল প্রায় ৫০ জন ছাত্রী। নরপশুরা সে রাতে হত্যার পাশাপাশি মেতেছিল ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগে। রাজারবাগ পুলিশের সদর দফতরে সে রাতে এক হাজার ১০০ বাঙালি পুলিশের রক্ত ঝরিয়েও ক্ষান্ত হয়নি বর্বররা, গুঁড়িয়ে দেয় পুরো ব্যারাক, জ্বালিয়ে দেয় সবকিছু। হামলা চালায় ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে। পাখির মতো গুলি করে মারে তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে। নির্মমভাবে হত্যা করে ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য. ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় শিক্ষককে। গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে কেবল জগন্নাথ হলেরই ১০৩ ছাত্রকে। ফার্মগেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চারপাশের রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় ছাত্র-জনতা। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারী মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই উড়ে যায় সব ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করে পুলিশ সদর দফতর। হামলা করা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশ, ধানমন্ডি, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দফতর ও শাঁখারীবাজারসহ গোটা ঢাকায়। রাত দেড়টায় ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। কিন্তু ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত বাণী।

এ বছর ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে এসেছে ২৫ মার্চের কালরাত। ’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাত থেকে এখন পর্যন্ত বাঙালি নিধনযজ্ঞের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। ইতোমধ্যেই শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। বাকিদের বিচারের দাবিতে এখনো সোচ্চার জাতি। শাহবাগের গণজাগরণ উত্তুঙ্গ করে তুলেছে দেশের মানুষকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে এখনো নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত-শিবির। বিপরীতে তাদের তান্ডব প্রতিরোধে জোট বেঁধেছে জনতা। ঘাতকদের রুখতে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সরকার ও সাধারণ জনতা।

জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সেই কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদদের। ‘গণহত্যার কালরাত’ স্মরণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি রাত ৮টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মশাল প্রজ্বালন করবে। এছাড়া রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট সারাদেশে আলো নিভিয়ে অন্ধকারে গণহত্যার প্রতিবাদ এবং শহীদদের স্মরণ করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দিবসটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবিতে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আর্কষণের জন্য এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষিত এই কর্মসূচিতে সারাদেশের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আলো নিভিয়ে নীরবতা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিবসটি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে যথাযথ মর্যাদায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার খন্ডচিত্র পালনের জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের দলের নেতাকর্মীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোর মিছিলের কর্মসূচি নিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। সিপিবি-বাসদের এ যৌথ আলোর মিছিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনের সামনে থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।