সূচিকে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টর ২০ দফা প্রস্তাব

335

গৃহীত ২০ দফা প্রস্তাবের প্রথম দফায় রাখাইন রাজ্যে সব হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সেখানে হত্যা, সংঘাত, বেসামরিক ব্যক্তিদের সম্পদ ধ্বংস এবং লাখ লাখ বেসামরিক ব্যক্তির বাস্তুচ্যুতিসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্রমবর্ধমান মাত্রায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

দ্বিতীয় দফায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অনতিবিলম্বে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, ধর্ষণ, হয়রানি এবং তাদের বাড়িঘর পোড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তৃতীয় দফা প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, মানবাধিকারের মান ও বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়া সবার সুরক্ষা, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন থেকে রক্ষা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও দায়ীদের বিচার করা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

চতুর্থ দফায় সব পক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে গত মার্চ মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গঠিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনসহ জাতিসংঘ, অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের অনতিবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আহ্বান জানিয়েছে।

পঞ্চম দফায় সংঘাতপূর্ণ সব এলাকায় কোনো ধরনের বৈষম্য না করে বাস্তুচ্যুত সব ব্যক্তির কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো এবং বিপন্ন ব্যক্তিদের সহযোগিতার জন্য মানবিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবের ষষ্ঠ দফায় বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর পেতে রাখা সব স্থলমাইন অপসারণ করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। সপ্তম দফায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও জাতিগত উসকানিমূলক বক্তব্যের নিন্দা জানাতে এবং সব ধরনের বৈষম্য ও শত্রুতা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে মিয়ানমার সরকার ও স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাবিষয়ক সর্বজনীন অধিকার সমুন্নত রাখতে এবং সু চিকে তাঁরই গড়া আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

‘মিয়ানমার সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করা’—২০১৫ সালের ১৮ মে সু চির দলের মুখপাত্রের ওই বক্তব্যের পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ারও নিন্দা জানাতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আহ্বান জানিয়েছে।

অষ্টম দফায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সু চিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ১৯৯০ সালে তাঁকে শাখারভ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল মানবাধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের কারণে। ওই পুরস্কার পাওয়ার আদর্শ থেকে সু চি বিচ্যুত হওয়ায় পুরস্কারটি প্রত্যাহার করা হবে কি না তা বিবেচনা করতেও সংশ্লিষ্টদের প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আহ্বান জানায়।

প্রস্তাবের নবম দফায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে সেখান থেকে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশসহ অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দিতে জোরালো আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তাদের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা বাড়াতে ইউরোপীয় কমিশন ও ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

দশম দফায় রোহিঙ্গার ঢল মোকাবেলাকারী দেশগুলোকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তার আগের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এগারোতম দফায় মিয়ানমারকে চাপ দিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানকে আহ্বান জানানো হয়েছে। বারোতম দফায় আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জোরদার, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণসহ জাতিসংঘের উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।

তেরোতম দফায় চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে মিয়ানমারে নৃশংসতা বন্ধ ও শান্তি ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

চৌদ্দতম দফায় মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে ইইউ পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিভাগকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা ইইউ বিবেচনা করছে কি না তাও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভকে স্পষ্ট করার সুপারিশ করা হয়েছে।

পনেরোতম দফায় মিয়ানমার পরিস্থিতির উত্তরণে ইইউয়ের নেওয়া উদ্যোগগুলো ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জানাতে ইইউয়ের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

ষোলোতম দফায় মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের বিবৃতি ও বক্তব্যকে স্বাগত জানাতে ইইউ ও সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

সতেরোতম দফায় পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে স্বতন্ত্র ও জাতিসংঘের নেতৃত্বে পর্যবেক্ষক মিশনকে সমর্থন জানানোর কথা বলেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আঠারোতম দফায় মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের একটি শাখা অফিস খোলার প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। উনিশতম দফায় রাষ্ট্রহীনতা দূর করতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার ২০১৪-২০২৪ সাল মেয়াদি পরিকল্পনাকে সমর্থন দিতে ইইউ ও সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয়।

গৃহীত এসব প্রস্তাব মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে বিশতম দফায়।

প্রস্তাবে রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন সংস্থার বক্তব্যও আমলে নিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।

পার্লামেন্ট সদস্যরা মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ও শাখারভ পুরস্কারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর নীরব ভূমিকার সমালোচনা করেন। বেশ কয়েকজন ইপি সদস্য ১৯৯০ সালে সু চিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দেওয়া ‘শাখারভ প্রাইজ ফর ফ্রিডম অব থট’ কেড়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। গৃহীত প্রস্তাবেও এ বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।