পাহাড়ে রহস্যময় গোপন আস্তানা

70
gb

বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪||

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর আশপাশে উঁচু পাহাড়ের গহীনে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা একাধিক গোপন আস্তানা গড়েছে বলে জানা গেছে। সেই আস্তানা থেকেই তারা ডাকাতি-অপহরণ, ছিনতাই ও ইয়াবা সংক্রান্ত অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দিনে তারা সেই আস্তানায় আত্মগোপনে থাকলেও রাতে বেরিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে বিভিন্ন এলাকায়। স্থানীয় বাঙালির পাশাপাশি অর্থবিত্তশালী রোহিঙ্গাদেরও টার্গেট করে ডাকাতি ও অপহরণ করে তারা। টাকা পেলে মুক্তি অন্যথায় অপহৃত ব্যক্তির প্রাণ কেড়ে নেয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। রোহিঙ্গাদের শীর্ষ সন্ত্রাসী হাকিম ডাকাত এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান হিসেবে কলকাঠি নাড়ছে।
 
স্থানীয়রা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অভিযান টের পেলেই সহজেই সেসব পাহাড়ি আস্তানায় ঢুকে  হারিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত অভিযান চালিয়েও তাদের ধরতে পারে না।
 
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহম্মদ ইকবাল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের মধ্যে হাকিম ডাকাত প্রধান। সে দীর্ঘদিন ধরেই আত্মগোপনে থেকে তার লোকজন দিয়ে ডাকাতি-অপহরণসহ গুরুতর নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। হাকিম ডাকাতসহ অন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান বাড়ানো হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে।
 
টেকনাফ ও উখিয়ার স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এখানে ভয়ঙ্কর রকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের ভয়ে আমরা স্থানীয় বাসিন্দারা সব সময় অজানা আতঙ্কে সময় পার করি। স্থানীয় কেউ কোনো বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ঝগড়া করলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে তার ওপর হামলা করে বা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তুলে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের আস্তানায় নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এমনকি নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। সম্প্রতি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা স্থানীয় যুবলীগ নেতা ওমরকেও একইভাবে হত্যা করে। তার দুই মাস আগে টেকনাফের নয়াপাড়া বাজার থেকে স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী ইলিয়াসকে দিনে দুপুরে তুলে নিয়ে যায়। পরে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান ইলিয়াস। এ রকম আরও অনেককে তারা তুলে নিয়ে গেছে। কেউ টাকায় মুক্তি পেয়েছে আবার কেউ নৃশংসভাবে হত্যা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন স্থানীয়রা।
 
স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যানুসন্ধানকালে জানা গেছে টেকনাফের নাফ নদী তীরবর্তী শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনেই দক্ষিণ-পূর্ব পাশে উঁচু পাহাড়গুলোর গহীনে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গোপন আস্তানা গেড়েছে। এ ছাড়া উখিয়ায় মধুছড়া, কুতুপালং, ইরানীপাহাড়, বালুখালীসহ আরও একাধিক পাহাড়ে এখন গোপন আস্তানা গেড়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। বিশেষ করে টেকনাফ উপজেলার জাদীমোরা সরকারি স্কুলের পেছনে তিন থেকে চারটি পাহাড়ের পরেই কোনো একটি দুর্গম পাহাড়ে বড় ধরনের একটি আস্তানা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যেখানে রোহিঙ্গা শীর্ষ সন্ত্রাসী হাকিম ডাকাতও অবস্থান করতে পারে।
 
তবে সুনির্দিষ্টভাবে ওই পাহাড়ের নাম জানা যায়নি। একেকটি পাহাড় এখানে এতটাই দুর্গম যে সেখানে পৌঁছাতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক বড় প্রস্তুতির প্রয়োজন। এ ছাড়াও ওই সন্ত্রাসীদের হাতে এফ-৪৭ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র-গোলাবারুদ রয়েছে। স্থানীয়রা এসব অস্ত্র ইতঃপূর্বে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে দেখেছেন। জাদীমোরা এলাকার ওই পাহাড়ে শোনা যাচ্ছে কাউকে অপহরণ করা হলে তাকে চোখ বেঁধে সেই আস্তানায় নেওয়া হয়। এরপর নির্যাতন চলতে থাকে। মোটা অঙ্কের টাকা মুক্তিপণ দিলেই ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যথায় নৃশংসভাবে হত্যা করে সেই পাহাড়েই মাটিচাপা দেওয়া হয়।
 
স্থানীয়দের তথ্যমতে, ওই পাহাড়ে রয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের পরিচালিত নিজস্ব ‘বিচার ও শাস্তির’ ব্যবস্থা। বাঙালিদের পাশাপাশি কোনো সাধারণ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তাকে সেখানে ধরে নিয়ে হত্যা-নির্যাতন করা হয়। পরে নিহত ব্যক্তির লাশ সেই পাহাড়েই দোয়া পাঠ করে দাফন-কাফন করা হয়। এ জন্য সেখানে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা বিশেষ ব্যবস্থা করে রেখেছে বলেও শোনা গেছে।
 
আরও জানা গেছে কয়েক মাস আগেও টেকনাফ শহরের পাশের একটি পাহাড়ে তিন স্ত্রীসহ আস্তানা গড়ে সহযোগীদের নিয়ে থাকত হাকিম ডাকাত। বর্তমানে সেই আস্তানায় আর কেউই থাকছে না বলেও শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে টেকনাফের স্থানীয় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে তুলে নিয়ে হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মুখে হাকিম ডাকাতের পাঁচ সহযোগী নিহত হয়। এরপর হাকিম ডাকাত কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। তবে সুযোগের অপেক্ষায় দুর্গম পাহাড়ে নতুন করে গোপন আস্তানা গেড়েছে বলে জানা গেছে।
 
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ সময়ের আলোকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের অনেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকছে। অভিযান শুরু হলেই তারা খবর পেয়ে যাচ্ছে, এরপর অনায়াসেই পাহাড়ের গহীনে ঢুকে যাচ্ছে তারা। সেখানে পুলিশ খুব সহজে পৌঁছতে পারে না। এসব পাহাড়ে বাঙ্কার স্থাপনের মাধ্যমেও আত্মগোপন করে থাকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।
 
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মধুছড়া, কুতুপালং, ইরানীপাহাড়, বালুখালীসহ আরও কয়েকটি স্থানে পাহাড়ে আস্তানা গেড়ে ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ইয়াবা কারবারসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। এখানে বেশি তৎপর রয়েছে চার থেকে পাঁচটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অত্যাচার-নির্যাতনে স্থানীয় অধিকাংশ বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা উখিয়া বা টেকনাফের বাইরে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও চট্টগ্রাম এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
 
এ প্রসঙ্গে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১ ডব্লিউ (গত ৯ সেপ্টেম্বর) কথা হয় রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহর সঙ্গে। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, কিছু রোহিঙ্গা খারাপ কাজ করছে। তবে সবাই না। যারা বিশৃঙ্খলা করে তাদের ব্যাপারে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে থাকি। তবে এসব ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ডাকাতরা থাকে না বলেও দাবি করেন তিনি।

 

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More