নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এটি যেমন একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন, তেমনি এটি আমেরিকার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি একাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আবাসন, ভাড়াটিয়া সুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রশ্ন। শপথ অনুষ্ঠানে ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট নেতা সিনেটর বার্নি সেন্ডার্স এবং কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্ড্রিয়া ওকাসিও–কার্টেজের উপস্থিতি সেই বার্তাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। অনুষ্ঠানে পাবলিক এডভোকেট জুমানে উইলিয়ামসের আবেগময় বক্তৃতা ছিল এই পরিবর্তনের সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের প্রতীক।
শপথ গ্রহণের বক্তৃতায় জোহরান মামদানি যে মূল সুরটি ধরেছেন, তা ছিল “আমি নই, আমরা”—এই ভাবনা। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, এই বিজয় বা এই প্রশাসন কোনো একজন মানুষের নয়, এটি নিউইয়র্কবাসীর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর মেয়রত্বের লক্ষ্য ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানো। বাসাভাড়া, শিশু যত্ন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা—এই মৌলিক বিষয়গুলোতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা তাঁর প্রশাসনের অগ্রাধিকার হবে—এই বার্তাই তিনি দেন।
এই মুহূর্তে আমেরিকার সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে ‘সোশালিস্ট’ এবং ‘ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট’—এই দুই ধারণার পার্থক্য এখনও পরিষ্কার নয়। অনেকের চোখে শব্দ দুটো প্রায় একই অর্থ বহন করে। রাজনৈতিক বিতর্কে এই অস্পষ্টতাই প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে। কখনো ভয়, কখনো অমূলক আশঙ্কার জন্ম দেয়—বিশেষ করে যখন এই শব্দগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যায়।
আমেরিকার প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানে ‘সোশালিজম’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোল্ড ওয়ারের সময় থেকে আমেরিকার অনেকের কাছে সমাজতন্ত্র মানেই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকোচন কিংবা একদলীয় শাসনের ছবি ভেসে ওঠে। ফলে কেউ নিজেকে সোশালিস্ট বললেই একাংশের মধ্যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়—রাষ্ট্র বুঝি সবকিছু দখল করে নেবে, বাজার থাকবে না, ব্যক্তিগত উদ্যোগের জায়গা সংকুচিত হবে।
কিন্তু ডেমোক্রেটিক সোশালিজম সেই ধারণা থেকে আলাদা। এটি মূলত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই কাজ করার কথা বলে। ব্যক্তিমালিকানার ব্যবসা থাকবে, বাজার থাকবে, নির্বাচন থাকবে। একই সঙ্গে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন ও গণপরিবহনের মতো মৌলিক বিষয়ে। লক্ষ্য সম্পূর্ণ সমতা নয়, বরং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা—যাতে কেউ শুধু দরিদ্র হওয়ার কারণে পিছিয়ে না পড়ে।
জোহরান মামদানির রাজনৈতিক ভাষ্য এই ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট ধারারই প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর প্রচারণায় এবং শপথ বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছে ‘affordability’ বা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টি। এটি কোনো আদর্শিক বিপ্লবের ডাক নয়। নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহরে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার প্রশ্নকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টরা । তাদের কথায়, সরকার যদি মানুষের নিত্যদিনের সমস্যার সমাধানে কাজে না আসে, তাহলে সেই সরকার অর্থহীন।
বার্নি সেন্ডার্স কিংবা আলেকজান্ড্রিয়া ওকাসিও–কার্টেজের রাজনীতিও একই সুরে বাঁধা। তারা কর্পোরেট শক্তির লাগাম টানার কথা বলেন, ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে চান। কিন্তু তারা কেউই গণতন্ত্র বাতিলের কথা বলেন না—বরং নির্বাচনের মাধ্যমেই পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। মামদানির শপথ অনুষ্ঠানে তাঁদের উপস্থিতি এই ধারাবাহিকতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানে জুমানে উইলিয়ামসের আবেগময় বক্তব্য এই বিভ্রান্তি ভাঙার একটি প্রয়াস হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই রাজনীতি কোনো ‘বাদ’-এর লেবেল নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। বাসাভাড়া, কাজের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মর্যাদা—এই প্রশ্নগুলোই মূল। আদর্শ নয়, মানুষের কষ্টই এখানে কেন্দ্র।
মামদানির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কে সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। সোশালিস্ট আর ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট—এই পার্থক্য বোঝা এখন আর শুধু রাজনৈতিক তত্ত্বের বিষয় নয়। এটি বাস্তব শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন। নিউইয়র্কবাসী দেখবে, এই ধারণা কাগজে নয়, শহরের রাস্তায়, বাসায়, স্কুলে ও হাসপাতালে কীভাবে রূপ নেয়। সেখানেই ঠিক হবে—এই নতুন অধ্যায় কতটা টেকসই, কতটা বদলে দিতে পারে নগরজীবনের বাস্তবতা।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন