বিচার শুরু হতেই সাড়ে ৩ বছর পার

মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা

চার্জ শুনানির জন্য মান্নান খানের মামলায় ২৫ ও হাসিনা সুলতানার মামলায় ২৯ ধার্য তারিখ পার হয়েছে * অধিকতর চার্জ ও আসামিদের অব্যাহতি শুনানি ২৬ ফেব্রুয়ারি

46

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মান্নান খান ও তার স্ত্রী হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলার বিচার শুরু হতেই সাড়ে তিন বছর পার হয়ে গেছে।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দুদক মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। এরপর থেকে আসামিপক্ষের ‘সময় আবেদন’, ‘তদন্ত কর্মকর্তার ব্যর্থতা’, ‘বিচারক পরিবর্তন’সহ নানা কারণে চাঞ্চল্যকর এ মামলা দুটির চার্জ শুনানি বিলম্বিত হয়েছে। শুধু চার্জ (অভিযোগ) শুনানির জন্য অদ্যাবধি মান্নান খানের মামলায় ২৫ ও হাসিনা সুলতানার মামলায় ২৯ কার্যদিবস পার হয়েছে।

সর্বশেষ গত বছরের ২ ডিসেম্বর মামলা দুটির অধিকতর চার্জ শুনানি ও আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার অধিকতর শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। বরাবরের মতো ওই দিনও আসামিপক্ষে সময় আবেদন করা হয়। আদালত তা মঞ্জুর করে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন। ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতে মামলা দুটি বিচারাধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম যুগান্তরকে বলেন, চার্জশিট দাখিলের পর থেকে প্রথম চার্জ শুনানি পর্যন্ত সময় পার হয়েছে প্রায় এক বছর। এরপর অধিকতর চার্জ শুনানিতে প্রায় দেড় বছর পার হয়েছে। বিষয়টি আদালতকে জানিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে অধিকতর চার্জ শুনানির জন্য দিন ধার্য করতে বলা হয়েছে।

কিন্তু বেশি সংখ্যায় মামলা থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বিচারক পরিবর্তনের কারণে প্রসিকিউশনের অধিকতর চার্জ শুনানি করতে হচ্ছে। এভাবে বিলম্বের কারণে চার্জ গঠনের মাধ্যমে আসামিদের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করা সম্ভব হয়নি।

মামলা দুটি দ্রুত চার্জ গঠনের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আমরাও চাই দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।

জানতে চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো অযৌক্তিক কারণে নয়, সম্পূর্ণ যৌক্তিক কারণে ও ন্যায়বিচারের স্বার্থেই মামলায় বিলম্ব হয়েছে। ন্যায়বিচার সবার প্রত্যাশা।

বিচার শুরু করতেই তিন বছর বছর পার : ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়।

একই বছরের ২২ নভেম্বর আদালত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আমলে নিয়ে চার্জ গঠন সংক্রান্ত শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। এরপর থেকে অদ্যাবধি নানা কারণে চার্জ গঠন সম্ভব হয়নি। মান্নান খানের বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট আদালতের আমলে গ্রহণের পর থেকে ৩ বছর ৪ মাস ১৯ দিন পার হয়েছে।

অপরদিকে হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে সম্পদের মামলা বিচারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এ মামলাটি বিচারের জন্য ২০১৫ সালের ১১ মে ঢাকা মহানগর আদালতে বদলি হয়।

ওই বছরের ১২ জুলাই হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট আমলে গ্রহণ করে চার্জ শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন আদালত। এরপর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে চার্জ গঠন শুনানি সম্পন্ন হয়নি। হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট আমলে নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিন বছরে ৬ মাস ৭ দিন পার হয়েছে।

এদিকে চার্জ শুনানির প্রথমদিকে বেশ কয়েকটি ধার্য তারিখে আসামিপক্ষের সময় আবেদনের কারণে চার্জ শুনানি সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি মান্নান খান দম্পতির দুর্নীতির মামলার চার্জ শুনানি হয়।

তবে ওইদিন তদন্ত কর্মকর্তার বড় গাফিলতির কারণে চার্জ গঠন হয়নি। আদালত ওইদিনই তদন্ত কর্মকর্তাকে দুই মামলায় জব্দ করা সব নথিপত্র দাখিলের নির্দেশ দেন।

এরপর দুই দফায় তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় নথিপত্র আদালতে দাখিলে ব্যর্থ হন। ওই বছরের ২৮ মে দুই মামলার নথিপত্র দাখিল করা হলে ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার চার্জ গঠনের আদেশের জন্য ১৬ জুলাই (ওই বছর) দিন ধার্য করেন। এরপর আদালতের বিচারক পরিবর্তন হয়।

নতুন বিচারক আসার পরও আসামিপক্ষের বেশ কয়েক দফায় সময় নেয়ায় চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করা আজও সম্ভব হয়নি। এছাড়া বিগত কয়েকটি ধার্য তারিখে মান্নান খান দম্পতি অসুস্থতার অজুহাতে সময় আবেদন করলেও তার সপক্ষে কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট আদালতে দাখিল করা হয়নি।

মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত : ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ ৪ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলা দায়েরের তিন দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট মান্নান খান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন।

অপরদিকে তার স্ত্রী হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একই বছরের ২১ অক্টোবর মামলা করে দুদক।

দু’দিনের মাথায় ২৩ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন হাসিনা সুলতানা। এরপর শুরু হয় মামলার তদন্ত। আর এ তদন্ত শেষ করতে দুদক প্রায় এক বছর সময় নেয়।

২০১৫ সালের ১১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। চার্জশিটে মান্নান খানের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে দেখা যায়, তার আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৬ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। তদন্ত শেষে হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৯ জুন আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।

মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More