সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় টাকা দিলে নিয়োগ, না দিলে বিয়োগ

93
gb

উত্তম কুমার পাল হিমেল,নবীগঞ্জ(হবিগঞ্জ)প্রতিনিধি ||

দীর্ঘদিন থেকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডে চলছে দুর্নীতি। এত কিছুর পরেও কোন ধরনের তদন্তই হয়নি রহস্যজনক কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগ থেকে শুরু করে অফিস সহকারী ও পাহারাদার নিয়োগেও চলে টাকার ছড়াছড়ি। এমনকি ক্ষমতার প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সার্কুলার উপেক্ষিত হয়। অভিযোগ রয়েছে এসবের নেপথ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সোয়েব। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে প্রভাষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও সেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগে মেধাবী ও মাষ্টার্স ডিগ্রীধারীদের বাদ দিয়ে টাকার বিনীময়ে এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ অনিয়ম হওয়ায় মেধাবী প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে অনিয়ম হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল সংশ্লিষ্ট দফতরে এসব বিষয়ে অবহিত করেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সোয়েবের নানা অনিয়ম সম্পর্কে সবচেয়ে তথ্য দাখিল করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি, ইকনোমিক্স, ফিনান্স, পরীসংখ্যানসহ বিভিন্ন বিভাগে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য গত বছরের জানুয়ারীতে সার্কুলার দেয়া হলেও কোন পরীক্ষা না নিয়ে এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি বিভাগে রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজনের বিশেষ সখ্যতার কারণে ২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য গত বছরের জুন মাসে ঐ বিষয়ে পূনরায় সার্কুলার দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. শাহি আলমের চাকুরির মেয়াদ শেষ হলে তিনি অবসরে চলে যান। পরে ওই বছরের ৪ঠা নভেম্বর প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বোর্ড। সার্কুলারে মাষ্টার্স ডিগ্রীধারীদের অগ্রধিকার দেওয়ার শর্ত থাকলেও এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি বিভাগে ২টি পদে ৭জন পরীক্ষা দিলেও চূড়ান্তভাবে মেধা তালিকায় রাখা হয় মুসলিমা আক্তার মুন্নী, শাম্মী পাল, তাইবা আক্তারকে। ওই তালিকায় ২য় ব্যাচের অনার্স মাষ্টার্সধারী শাম্মী পাল (জিপিএ ৩.৮২), ৩য় ব্যাচের অর্নাস মাষ্টার্সধারী মুসলিমা আক্তার মুন্নী (৩.৮৩) এবং সবচেয়ে জুনিয়র ৪র্থ ব্যাচের শুধু মাত্র অনার্সধারী তাঈবা আক্তার (জিপিএ ৩.৮২)। বিশ্ববিদ্যালয়েল নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যান্য বিষয়ে সার্কুলার মানা হলেও এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি বিষয়ের ক্ষেত্রে সে আইন লংঘন হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২জন সংসদ সদস্য সভায় উপস্থিত না হওয়ায় এ ব্যাপারে কোন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স এন্ড পলিসি বিষয়ের ক্ষেত্রে সে নিয়ম না মেনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সোয়েব, এবং ডিন জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজন অর্থ ও প্রভাবের কারণে সিনিয়র ব্যাচের শাম্মী পালকে বাদ দিয়ে মাস্টার্সধারী মুসলিমা আক্তার মুন্নী ও অপর জুনিয়র শুধু অনার্সধারী (মাস্টার্স অধ্যায়নরত) তাঈবা আক্তারকে চুড়ান্ত নিয়োগ প্রদান করেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় (সাবজেক্টটের) প্রতিযোগী ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের স ার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগে নিয়োগের সময় মাস্টার্সধারী কোন আবেদনকারী না পাওয়ায় নিয়োগ দেয়া বন্ধ করা হয়।

গতকাল দুপুর ১টার দিকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মতিয়ার রহমান হাওলাদারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল ইসলাম। তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানার পর এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ দফতর ও নিয়োগ কমিটির যারা থাকেন তাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেন। পূনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে কথা বলার জন্য তাকে অনুরোধ করা হলে তিনি বলেন, স্যার মিটিংয়ে আছেন। আর এসব বিষয়ে স্যার কিছুই বলতে পারবেন না। স্যার এসব সম্পর্কে কোন কিছু জানেনই না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পূনরায় ভিসির বক্তব্য নেয়ার জন্য মুঠোফনে একাধিকবার ফোন দেয়ার পর তিনি ফোন ধরেননি। তবে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রধান আনিসুর রহমান সব কিছু শোনার পর তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরং তিনি এ বিষয়ে নিয়োগ বোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সোয়েব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দীর্ঘদিন থেকে একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটির আমি কেউ নই। নিয়োগ কমিটিতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরাসহ আরও অনেকেই। এসব বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।

যোগ্যতা থাকার পরেও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না হওয়ায় অনেকটা ক্ষুব্ধ শাম্মী পাল। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কুলার অনুযায়ি তিনবার আবেদন করা হলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে চাকরি দেয়া হয়নি। অথচ অপর জুনিয়র শুধু অনার্সধারী (মাস্টার্স অধ্যায়নরত) তাঈবা আক্তারকে চুড়ান্ত নিয়োগ প্রদান করা হয় নিয়ম না মেনেই। যোগ্যতার বিচার যেখানে একেবারেই নেই সেখানে সার্কুলার দিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়ার নাটক কেন করা হয়? অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগে সার্কুলার অনুযায়ি যোগ্যব্যক্তি না পাওয়ায় নিয়োগও বন্ধ করে দেয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. শাহি আলম ও ডিন ড. জসিম উদ্দিন আহমদের যোগসাজশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা ছাড়া অবৈধ নিয়োগ পরীক্ষায় এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স বিভাগে শাম্মী পাল, বিবি মরিয়ম এবং সোসলজি বিভাগে মধুমিতা ভট্টাচার্য্য, ইষিতা দেব এবং দিল আরা অংশগ্রহন করেন। কিন্তু ইকনোমিক্স পলিসি বিভাগে শাম্মী পাল ফলাফলে এগিয়ে থাকার পাশাপাশি মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন হওয়া সত্তে¡ও সাবেক ভিসি ড. শাহি আলম এবং ডিন ড.জসিম উদ্দিন আহমদ অর্থের বিনীময়ে অধৈভাবে ইকনোমিক্স পলিসি বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী শাম্মী পালকে বাদ দিয়ে সাবেক ভিসি ও ডিনের এলাকার পছন্দের প্রার্থী শুধু মাত্র অনার্স পাস বিবি মরিয়মকে এবং সোসলজি বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী দিল আরাকে বাদ দিয়ে মধুমিতা ভট্টাচার্য্য, ইষিতা দেবকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেন, বিষয়টি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা থাকলেও সিন্ডিকেট সদস্য ২জন সংসদ সদস্য ছাড়া সাবেক ভিসি ও ডিনের যোগসাজশে কিভাবে তা সম্পন্ন করা হয় ? এছাড়াও গত ২০১৫ সালেও এগ্রিকালচার ইকনোমিক্স ও পলিসি বিভাগে মেধা তালিকায় ৩য় অবস্থানে থাকা শেরেফ উল আলমকে না নিয়ে ৪র্থ অবস্থানে থাকা নুর মোজাহিদকে টাকার বিনীময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে পুনরায় নিয়োগ পরীক্ষায় ওই ব্যাচর প্রার্থী শাম্মী পালকে বাদ দিয়ে পূর্বের ব্যাচের শেরেফ উল আলমকে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র আরও জানায়, অতীতে এমএস না থাকা সত্তে¡ উপাচার্যের মেয়েকে পদোন্নতি দিতে শিক্ষক পদোন্নতি নীতিমালা সংশোধন করে শুধু কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে শিক্ষকরা এমএস ছাড়া সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন এমন নিয়ম চালু করেন রেজিস্ট্রার সোয়েব। এমনকি টাকার বিনীময়ে পূর্বে বিএনপি পরিবারের একাধিক জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এরমধ্যে তাহমিনা আক্তার চৌধুরী টুলটিকর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মাযহার চৌধুরীর মেয়ে। অন্যজন আফরিন মনির পরিবার বিএনপির রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী।

gb

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More