Bangla Newspaper

মৌলভীবাজার মনু নদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন,মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমা ল ও শহরতলী ব্যাপক এলাকা প্লাবিত

427

নজরুল ইসলাম মুহিব মৌলভীবাজার প্রতিনিধি  ||

অবশেষে বন্যার কবল থেকে মৌলভীবাজার শহর রক্ষা পায়নি। শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় শহরের বারইকোণাতে মনু নদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রায় ৩০ ফুট স্থান ভেঙ্গে মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমা ল শহরতলীর আশপাশের ব্যাপক এলাকা প্লাবিত করে। রাতের বেলা আকস্মিক এই ভাঙ্গনের ফলে কয়েকশত ঘর বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। ঘরের মূল্যবান মালামাল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন থেকে রাত জেগে অপেক্ষা আর উৎকন্ঠা কখন বাঁধ ভেঙে বন্যার পানি প্রবেশ করবে। ঠিক শনিবার মধ্যরাতে নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে মৌলভীবাজার পৌর এলাকার ৬,৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের বাসা বাড়ি এবং শহরতলী ৫০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। পাড়া মহল্লার রাস্তাঘাটের উপর দিয়ে বইচে বন্যার পানির স্রোত। শহরের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচিয়ে পানি আসতে থাকলে ঝুকিপূর্ণ কয়েকটি স্থানে শনিবার থেকে সেনাবাহিনী পানি উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, জেলা প্রশাসন সহ স্থানীয় জনসাধারণ বাঁধ রক্ষায় বালি ভর্তি বস্তা ফেলে চেষ্টা করে। ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে দ্রুত বেগে পানি প্রবেশ করে মৌলভীবাজার পৌরসভার, সদর উপজেলা পরিষদ, বারইকোণা, পূর্ব ও পশ্চিম বড়হাট, বড়কাপন, পশ্চিম ও পূর্ব ধরকাপন, শেখেরগাও, দ্বারক, খিদুর, গোবিন্দশ্রী,শাহবন্দর,শ্রীরামপুর,ঘড়–য়া মোস্তফাপুর এলাকার বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। চলাচলের সকল রাস্তা ৪থেকে ৫ ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। বন্যা কবলিতরা নিজেদের দোতলায় কিংবা পাশ্ববর্তী আÍীয় স্বজনের বাসাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।


গভীর রাতে বাঁধ ভাঙ্গায় কোনো দোকানীই মালামাল সরাতে পারেননি। বন্যার পানি পৌরসভার ৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত করে নীচের দিকে গড়িয়ে গিয়ে মোস্তফাপুর ইউনিয়ন ও কনকপুর ইউনিয়ন এলাকায় পানি বাড়ছে। জেলা শহরের চারটি সরকারী খাদ্য গুদামে বন্যার পানি ঢুকায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার চাল ও গম
ক্ষতিগ্রস্থ হবার আশংকা করছেন জেলা খাদ্য বিভাগ। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মনোজ কান্তি দাশ চৌধুরী জানান, চারটি গুদামে ১ হাজার ৫শ’ ৬৮ মেট্রিক টন চাল ও ৪২৪ টন গম মজুদ রয়েছে। মজুদকৃত এই চাল ও গমের মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা। গুদামে যে উচ্চতায় পানি ঢুকেছে তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। প্রায় ৫৫০ মেট্রিক টন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা হবে। অপর দিকে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর,শ্রীমঙ্গল ও সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তলিয়ে রয়েছে এ সব বাড়ি ঘর সহ রাস্তাঘাট। পানি বন্দী রয়েছে জেলায় প্রায় ৬ শত গ্রামের ৩.১৬ লাখ মানুষ। জেলা সদরের সাথে উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত ৪ দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে ৫ জন মারা গেছে।
মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মোঃ ফজলুর রহমান জানান রড়হাট বন্যা কবলিত হওয়ায় তার নিজের বসত ঘরে দেড় ফুট পানি। পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এখন বন্যা কবলিত। শহর রক্ষার জন্য যেখানে বালু ভর্তি বস্তা দিতে হয় সবই পৌরসভার লোকজন এবং পৌরসভার টাকা দিয়ে দৈনিক রোজে মজুর নিয়োগ করে করা হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠান যে তৎপরতা করেছে সেটা লোক দেখানো ও ফেসবুক পোষ্ট দেয়ার জন্য। মৌলভীবাজার সদর উপজেলা ছাড়াও, কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার বন্যার্তদের দুর্ভোগ বেড়েছে। পানিবন্দী মানুষ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকটে আছেন। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজার শহরে মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ, মৌলভীবাজার সরকারী মহিলা কলেজ, প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ও মৌলভীবাজার টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে আশ্রয় শিবির খোলা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, মনু নদীর পানি মৌলভীবাজার শহরের কাছে চাঁদনীঘাট পয়েন্টে ১৫৪ সেন্টিমিটার ও মনু রেলওয়ে ব্রীজের কাছে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধলাই নদী বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু কুশিয়ারা নদীতে গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ১ সেন্টিমিটার পানি কমে বর্তমানে তা বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক আজ ১৭ জুন রবিবার বিকাল ৬টায় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসের মুন হলে এক জরুরী প্রেসব্রিফিং করেন। প্রেসব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানিয়েছেন,জেলায় বন্যায় ৫ উপজেলার ৩০ টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার মোট ৪০ হাজার ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রেসব্রিফিংয়ে জানানো হয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সেনাবাহিনীর ২১ ইঞ্জিনিয়ার্স এর একটি ইউনিট, জেলা পুলিশ, ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন, স্বাস্থ্যবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, বিএনসিসি, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাও নিয়োজিত আছে। দুর্গত এলাকা থেকে জরুরী যোগাযোগের জন্য একটি (০১৭২৪৬৮৫৭৮৪) হটলাইন খোলা হয়েছে। বন্যাকবলিত এই জেলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন কর্তৃপক্ষ।
জেলায় স্মরণ কালের মনু ও ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের ২৫ স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত এই জেলায় ৫০ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫৩৯০ জনকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রেনেয়া হয়েছে। বন্যায় আক্রান্তদের উদ্ধারে কাজ করছে,সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ।
মৌলভীবাজার সদরে ৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এই আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আছে সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, টেকনিকেল স্কুল এন্ড কলেজ, পলিটেকনিক ইনসট্রিটিউট, পিটিআই। এছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে আরো কয়েকটি খোলা হয়েছে যেখানে বিএনসিসি, স্কাউটসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে খিচুরি রান্না করে বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক জানান সেনা বাহিনীর ৪টি টিম বন্যা দূর্গত এলাকায় কাজ করছে। তারা পানি বন্দিদের উদ্ধারের কাজে ১৮টি ¯পীডবোট ব্যবহার করছে। আরো সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক প্রেস ব্রিফিংএ আরো জানান নগদ ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ৭শ ৪৩ মেট্রিক টন চাইল বরাদ্ধ করা হয়েছে। মজুদ আছে ১ হাজার ৩৭ মেট্রিক টন চাউল। আরো বরাদ্ধ হয়েছে ৫০০ মেট্রিক টন চাউল ও নগদ ১০ লক্ষ টাকা। ৩ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট আশ্বাস মিলেছে।
শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিজিবির ৪টি গাড়ি টহল দিচ্ছে। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে ৭৪ টি মেডিকেল টিম বন্যাকবলিত এলাকায় কাজ করছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন আগামীকাল (সোমবার) মৌলভীবাজার আসবেন দূর্যোগ, ত্রাণ ও পূনর্বাসন মন্ত্রী মোফজ্জল হোসেন মায়া। তিনি ২/১ টি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করবেন। আরো বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও আসছেন।

Comments
Loading...