স্বাস্থ্য নিরাপত্তা না থাকলে করোনার শঙ্কা আইএলওর: সব কারখানা খুলছে ২ মে

218

জিবি নিউজ২৪.কম ডেস্ক ||

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সীমিত আকারে পোশাক কারখানা খোলা হয়েছে। আগামী ২ মে থেকে পর্যায়ক্রমে সব কারখানা চালু করা হবে। তবে শ্রমিকদের এখনই গ্রাম থেকে না ফেরার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। তবে কারখানা খোলার সঙ্গে শ্রম অসন্তোষও বাড়ছে। শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন-ভাতা ও লে-অফ ইস্যুতে মূলত শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন।
এদিকে করোনা ভাইরাসের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে লকডাউন শিথিল করা এবং শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। মঙ্গলবার ( ২৮ এপ্রিল) সংস্থার জেনেভা অফিস থেকে পাঠানো এত বিবৃতিতে বলা হয়, অন্যথায় করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় দফা ঢেউ আসতে পারে।
বিকেএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গত সোমবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে লকডাউনের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে খুলছে পোশাকশিল্প কারখানা। অর্থনীতির চাকাকে আবারও সচল করার জন্যই খোলা হচ্ছে।
বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি পর্যায়ক্রমে খুললেও এই মুহূর্তে দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিক ভাই-বোনদের কর্মস্থলে না ফেরার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেমন-ফ্যাক্টরিতে ঢোকার আগে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, ব্লিচিংমিশ্রিত পানিতে জুতা ভিজিয়ে প্রবেশ করা, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করা, মাস্ক ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চত করে কর্ম পরিচালনা করা, স্বাস্থ্যবিধিগুলো যতটুকু আমাদের দ্বারা সম্ভব আমরা গ্রহণ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘জীবন-জীবিকার সন্ধানে আমাদের নামতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকাকে আবারও সচল করতে হবে। এমনই অবস্থার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসুরক্ষা মেনে গত রবিবার থেকে নিটওয়ার সেক্টরের নীটিং, ডায়িং ও স্যাম্পল ইউনিট খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বিকেএমইএর পক্ষ থেকে। ২ মে থেকে গার্মেন্ট শাখাও খোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
তবে জরুরি প্রয়োজনে রবিবার থেকেই অল্প পরিশরে গার্মেন্ট শাখা খোলা যাবে বলেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী সোমবার ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেএমইএর ৮৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। সোমবার আরও ৫৪টি ফ্যাক্টরি খুলেছে বলে জানান বিকেএমইএর এ নেতা।
এদিকে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে দেশব্যাপী কারখানা চালু হওয়ার পর দিনে দিনে এ সংখ্যা বাড়ছে। কারখানা চালু করার পর দ্বিতীয় দিন গত সোমবার ৪০০ কারখানা নতুন করে খুলেছে। এ নিয়ে সোমবার পর্যন্ত এক হাজার ৮২০টি কারখানায় উৎপাদন কাজ হয়েছে। তবে কারখানা খোলার সঙ্গে শ্রম অসন্তোষও বাড়ছে। রবিবার দেশব্যাপী ২০টি কারখানায় শ্রম অসন্তোষের খবর পাওয়া গেলেও গত সোমবার এই সংখ্যা ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে বলে শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন-ভাতা ও লে-অফ ইস্যুতে মূলত শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবারও চাকরি রক্ষায় শিল্পাঞ্চলমুখী শ্রমিকদের আসতে দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরে। এছাড়া আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জালাল উদ্দিন জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোগড়া এলাকার স্টাইলিশ গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ এক মাস আগে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা লে-অফ ঘোষণা করে। লে-অফ করার আগে ৩০ শ্রমিক ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৬০ শতাংশ বেতন বকেয়া ছিল। দুই দিন ধরে কারখানার শ্রমিকরা বন্ধ কারখানা দ্রুত খুলে দেওয়া এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
শ্রমিকনেতা ও জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, কারখানা খুললেও শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাদের চাকরি থাকবে কি না। তারা আসলে নিশ্চিত হতে চায়, তাদের চাকরি যাবে না। এছাড়া বেতনভাতা, ছাঁটাই আর লে-অফ (সাময়িক বন্ধ ঘোষণা) ইস্যুতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ১৩ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে। প্রকৃত ছাঁটাই এর চেয়ে অনেক বেশি।
গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতি সম্মান রেখে আমরা এখন কোনো কারখানাতে শ্রমিক ছাঁটাই না করতে মালিকপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি। আগামী দুই মাস কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হবে না। তবে তিনি অভিযোগ করেন, বেশকিছু কারখানায় শ্রমিকরা অযৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন। তিনি বলেন, সরকার এবং গার্মেন্টস খাতকে বেকায়দায় ফেলতে এর পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাকে খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার খবরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা শিল্পাঞ্চলের দিকে আসছে। ক্রমেই এ ভিড় বাড়ছে। যদিও সরকারের নির্দেশনা ছিল, দূরবর্তী শ্রমিকদের না এনে স্থানীয়দের দিয়ে উত্পাদনকাজ চালাতে হবে। তবে দূরবর্তী শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় শ্রমিকরা ঢাকামুখী হচ্ছে বলে জানা গেছে। শিমলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুট দিয়ে গত সোমবার সকাল থেকেই ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে মানুষজন। এর বেশির ভাগ যাত্রীই গার্মেন্টস ও কলকারখানার শ্রমিক। যে যেভাবে পারছেন, ঢাকামুখী হচ্ছেন।
এদিকে করোনা ভাইরাসের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে লকডাউন শিথিল করা এবং শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। গতকাল মঙ্গলবার সংস্থার জেনেভা অফিস থেকে পাঠানো এত বিবৃতিতে বলা হয়, অন্যথায় করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় দফা ঢেউ আসতে পারে। মালিকপক্ষকে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে কর্মক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মানার তাগিদ দেওয়া হয়। কীভাবে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তার বেশকিছু উপায়ও বাতলে দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিধির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল শ্রমিক, তাদের পরিবার ও সমাজের বড়ো আঁশের জীবন রক্ষার করা সম্ভব। যার ফলে কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা সম্ভব। একই বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) মহাপরিচালকও স্বাস্থ্য কর্মীসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের যথাযথ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।