বাংলাদেশের সড়ক যেন মৃত্যুকূপ

51
gb

মো:নাসির, বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪                  

সড়কে মৃত্যু যেনগা সওয়াহয়ে যাচ্ছে সবার; নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনায় তাইভ্রূক্ষেপনেই কারোরই! প্রতি ঈদেই সড়কে অসংখ্য মানুষ হতাহত হন প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হতে যাওয়ার সময় মনে যে আনন্দ থাকে, ফেরার পথে সে আনন্দটুকু সঞ্চিত থাকে কারও কারও মনে আনন্দ বিষাদে পরিণত হতেও সময় লাগে না দিন দিনই সড়ক পরিণত হচ্ছে মৃত্যুকূপে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলার সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ একদিকে ঝরছে রক্ত অন্যদিকে প্রিয়জনের অশ্রুবিন্দু              রক্তঅশ্রুপাতের সম্মিলনে বাংলার শ্যামল প্রান্তর সিক্ত হলেও এতটুকু দোল খায় না পরিবহন সংশ্লিষ্টদের পাষাণ হৃদয় তাই দিনের পর দিন তারা সড়কে দুর্ঘটনার নামে হত্যাকাচালিয়ে যান হত্যাকাের বিচার তেমন একটা হয় না বললেই চলে আইনের ফাঁকফোকর ডিঙিয়ে ঠিকই সুরক্ষিত থাকেন পরিবহন মালিকশ্রমিকরা হত্যাকাবন্ধে সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও আখেরে যে সবই কেবল কথার কথাইপ্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিদিনের সংবাদপত্র টেলিভিশনে চোখ রাখলে খোলা কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে গতকাল ১৬ তারিখ পর্যন্ত দিনে সড়কে ঝরেছে ১০২ প্রাণ ঈদের আগেপরে এসব মৃত্যু হয়েছে

আজ (১৬ আগস্ট) ময়মনসিংহে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন একই পরিবারের ৫ সদস্য। এ পরিবারের আরেক সদস্য এবং চালক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া আরও ৯ জেলায় মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। একদিনের মৃত্যুর হিসাবই দাঁড়াচ্ছে ১৬ জনে। গত ১৫ তারিখে মারা গেছেন ২৮ জন, ঈদের দিন এবং ঈদের আগের ও পরের দিনে মারা গেছেন ৩৩ জন। ১১ তারিখে ৫, ১০ তারিখে ১৩ ও ৯ তারিখে ঝরেছে ৭ প্রাণ। ৮ দিনে ১০২ জনের প্রাণহানি হলেও আহত হয়েছে কয়েকশ। এদের একাংশ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করবেন, চিকিৎসাধীন মারাও যাবেন কেউ কেউ। সামনে থাকা মৃত ১০২ শুধু সংখ্যা নয়। ১০২ জন মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত আরও অনেক জীবন। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় সাধারণত পরিবারের একজনের উপার্জনেই সংসার চলে। গৃহকর্তার মৃত্যু মানে পুরো পরিবারটির পথে বসে যাওয়া। অনেকেরই নেই বিকল্প আয়ের উৎস কিংবা অর্থকরী কাজের সুযোগ।

সড়ক দুর্ঘটনা তথা মৃত্যু রোধে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছে কয়েকটি সংস্থা। বলাবাহুল্য, তাদের প্রাণপাত চিৎকার কোথাও বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটেনি। সড়কের অব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, ২০১৫ সাল থেকেই ঈদুল ফিতরের আগে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমরা (যাত্রী কল্যাণ সমিতি) প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছি। প্রতিবেদন প্রকাশকালে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা সন্নিবেশন করেছি। বিগত ঈদগুলোতে যেসব সমস্যার কথা বলেছিলাম, এ সমস্যা এবারের ঈদেও দেখা গেছে। আমাদের সুপারিশমালা আমলে নিয়ে যদি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে এবার মৃত্যুর মিছিল আরও কম থাকত। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হতাম। হয় কী- নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে, সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে আমরা যা-ই বলি এসব আমলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় না সরকারের পক্ষ থেকে। যে কারণে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়।

বিগত ঈদের সঙ্গে সদ্য সমাপ্ত ঈদের তুলনা করে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আমরা গত ঈদে যা দেখেছি, এবারও একই দৃশ্য লক্ষ করছি। ঈদের আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে যেভাবে সবার উপস্থিতি লক্ষ করেছিলাম, একাধারে সড়কমন্ত্রী থেকে শুরু করে সড়ক সচিব, পুলিশের আইজি, র‌্যাবের ডিজি সবাইকে সক্রিয়ভাবে কাউন্টারে কাউন্টারে ঘুরতে দেখেছি; মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ করতে দেখেছি। কিন্তু ঈদের পর সবাই আবার বাসায় ঢুকে পড়েছেন! এদিকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে শুরু করল বেপরোয়া চালকরা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, বিষয়টা হলো- ঈদের আগে যে রকম মনিটরিং করা হয়, ঈদের পরে সে রকম করা হয় না। অন্যদিকে যেসব চালক গত ১৫ দিন অনবরত গাড়ি চালাচ্ছিলেন তাদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। যেসব বাস ঈদের আগে রাত-দিন ট্রিপ দিয়েছে, এখন ঈদের ছুটিতে গ্যারেজগুলো বন্ধ রয়েছে অথবা অতিরিক্ত যাত্রীর ছাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবহন মালিকরা চালকদের রাস্তা থেকে সরাচ্ছেন না। তাদের বলছেন- এ ট্রিপটা মেরে আসেন, আপনাকে ট্রিটমেন্ট দেওয়া হবে!

বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধানে আলোকপাত করে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এই যে ছোটখাটো অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, গাফিলতি- এগুলোই বড় বড় দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বিষয়গুলো প্রতিবার বলি কিন্তু বলাটায় যদি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কর্ণপাত করতেন তাহলে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হতাম আমরা।

সারা বছর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও ঈদের সময় তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সড়কের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এ সময়। ঈদে যারা বাড়িতে যান, এরাই ফেরেন কয়েকদিন আগে-পরে। বাড়তি গাড়ির চাপ সামলাতে এ সময়ে ট্রাফিক সিস্টেম আরও জোরদার করাই সঙ্গত কিন্তু উল্টো সেটা দুর্বল হয়ে পড়ে আরও। ছুটির কারণে ভেঙে পড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের অভাবও দেখা দেয় প্রকটভাবে। পুরো সড়কপথেই সৃষ্টি হয় এক ধরনের নৈরাজ্য ও নিয়মভঙ্গের মহোৎসব। যাত্রীর চাহিদা পূরণ করতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লোকাল বাসগুলো এ সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাড়া নিয়ে যায়। বাড়তি উপার্জনের আশায় পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকরা এ ঝুঁকি নেন। কিন্তু নতুন গন্তব্যের রাস্তা সম্বন্ধে এদের অনেকেরই পূর্ব ধারণা না থাকায় হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে নতুন ও নিয়মিত দূরপাল্লার গাড়ির চালকরা এ সময় অতিরিক্ত ট্রিপ দেন। যার প্রভাব পড়ে তাদের স্বাস্থ্য ও মনোজগতে। নির্ঘুম চোখ, ক্লান্ত শরীর ও মন বিধ্বস্ত থাকায় সহজেই এরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন। ঈদের আগে রাস্তায় যানজট থাকলেও ঈদের দিন এবং পরের দুই একদিন রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। যানজটে ‘অভ্যস্ত’ হওয়া চালকের ফাঁকা রাস্তায় বেসামাল অবস্থা হয়। গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হলে সহজেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা।

ইদানীং আনন্দভ্রমণেও দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। আত্মীয়বাড়ি, এলাকায় কিংবা দূরের পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার সময় বেপরোয়া চালনায় ঘটে হতাহতের ঘটনা। সচরাচর কম বয়সীরাই আনন্দভ্রমণে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। পূর্বাপর বিবেচনা বোধ না থাকায় এরা অনেক অকাণ্ডের জন্ম দেন।

মৃত্যুর মচ্ছবে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা অনেকটা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো। গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে গড়ে তুলেছিল দুর্বার আন্দোলন। তাদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়ায় সমর্থন দিয়েছিল সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষ। সরকারও একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সব দাবিই মেনে নিয়ে আইনে সংস্কার আনে। সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল, এবার বুঝি একটা হিল্লে হবে। বেদনাবিধুর ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ দেখতে হবে না। কিন্তু আশার গুড়ে বালি! বেপথু সড়ক ব্যবস্থাপনা পথে ফেরেনি। পরিবহন মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি সাধারণ মানুষের। সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছেন, খোদ সরকারের ভেতরেই ঘাপটি মেরে আছে পরিবহন খাতের দুর্বৃত্তরা। এদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিলেই শৃঙ্খলা ফিরবে সড়কে।

সরকারও যে পরিবহন মাফিয়াদের কাছে অনেকাংশেই জিম্মি, সেটাও বিভিন্ন সময়ে প্রতিভাত হয়েছে। বিগত দিনে রাজধানীতে অবৈধ সিটিং সার্ভিস বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অসহযোগিতায় শেষপর্যন্ত তা করা সম্ভব হয়নি। অনেকটা রণে ভঙ্গ দিয়েই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘ওরা অনেক শক্তিশালী’!

ব্যক্তি শক্তিশালী হতে পারে, সংস্থাও শক্তিশালী হতে পারে কিন্তু সেটা এতটা শক্তিশালী কীভাবে হবে যেখানে খোদ সরকারেরই নিয়ন্ত্রণ থাকবে না! পরিবহন খাতের মাফিয়ারা যেমন সরকারে আছে, তেমনি ‘সরকার’ও আছে তাদের সঙ্গে। কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে! মাঝখানে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে রক্ত ঝরছে সাধারণ মানুষের।

সরকার ও পরিবহন খাতের কর্তাব্যক্তিরা- দুই পক্ষ যতদিন না ঐকমত্যে না পৌঁছাবে ততদিনই সড়কের মড়ক থামবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More