ব্রিটেনের রাজনীতিতে শুরু হলো ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুগ। দেশটির ৫৯তম সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবেলায় আগামীকাল (২১ জুলাই ২০২৬) থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
সোমবার (২০ জুলাই) ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দেওয়া ভাষণে জনগণকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এই পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
ব্রিটেনের সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, রাজা তৃতীয় চার্লস তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। বাকিংহাম প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ডাউনিং স্ট্রিটে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বার্নহ্যাম।
দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম বক্তব্যে উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিত বার্নহ্যাম বলেন, ব্রিটেনের মানুষ পরিবর্তন, স্থিতিশীলতা এবং নতুন আশার প্রত্যাশা করছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন পেছনে ফেলে দেশের মানুষের আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বার্নহ্যাম বলেন, দেশের উন্নয়ন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক হতে পারে না; যুক্তরাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়েই এগিয়ে নিতে হবে।
তাঁর ভাষায়, মানুষের আস্থা অর্জনই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করবেন। একই সঙ্গে গৃহহীনতা কমানো, আবাসন নির্মাণ, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
অন্যদিকে দায়িত্ব হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়েন স্যার কিয়ার স্টারমার। বিদায়ি বক্তব্যে তিনি দেশ ও দলের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন পর লেবার পার্টিকে সরকারে ফিরিয়ে আনাকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে দেশের স্বার্থে তাঁর সফলতা কামনা করেন।
বার্নহ্যামের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা পরিবর্তিত হলে সেই নেতাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে ব্রিটেনের নেতৃত্বে এলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।
বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের দাবিতে ধারাবাহিক ভূমিকা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক মহলে তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। স্থানীয় সরকারকে আরো ক্ষমতায়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে ব্রিটেনের রাজনীতিতে আঞ্চলিক উন্নয়ন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নটি আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ইংল্যান্ডের উন্নয়ন নিয়ে সোচ্চার এই নেতা এখন জাতীয় পর্যায়ে সেই দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে লেবার সরকারের নীতিনির্ধারণে স্থানীয় সরকারকে আরো কার্যকর ভূমিকা দেওয়ার উদ্যোগ জোরালো হতে পারে।
ব্রিটেনের রাজনীতিতে এই নেতৃত্ব পরিবর্তন কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর বিদায় ও আরেকজনের দায়িত্ব গ্রহণ নয়; এটি নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন নেতৃত্বের সূচনা। এখন নজর থাকবে—উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের আস্থার প্রতীক ‘কিং অব দ্য নর্থ’ জাতীয় নেতৃত্বেও সেই আস্থা কতটা ধরে রাখতে পারেন এবং পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবে কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন