ঢাকা, ২৪ এপ্রিল ২০২৬||
দেশে হামের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্টেপ টু হিউম্যানিটি বাংলাদেশের উদ্যোগে “হাম নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক নীতি সংলাপ: টিকাদান কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতা জোরদারকরণ” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল সভা শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ৮টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় প্রধান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট প্রবাসী সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদ। তিনি তার সাম্প্রতিক গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে দেশের বর্তমান হামের সংকট, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের হামের এই পুনরুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—এটি কি কেবল জনস্বাস্থ্য সংকট, নাকি নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন? এ বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজে দৃশ্যমান ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত ৯০ শতাংশের বেশি কভারেজ অনেক ক্ষেত্রে কমে যাওয়ায় সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকি বেড়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লাস্থ Bangladesh Academy for Rural Development (BARD)-এর সাবেক পরিচালক ড. কামরুল হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. সেলিনা আক্তার, এমবিবিএস, পিজিটি (গাইনি ও অবস), ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা।
আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও সাংবাদিকরা। তাদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন (বিশেষ সংবাদদাতা বাসস), ফিরোজ মিয়া (সম্পাদক, দৈনিক ভোরের সূর্যোদয়), শামসুল হাবিব (যুগান্তর), প্রবাসী ব্যবসায়ী শাখাওয়াত ইকবাল, কানাডা প্রবাসী তামিম হোসেন, প্রকৌশলী কোরা হাসান ইভানা, উদ্যোক্তা ও কনসালট্যান্ট এবং এশরার জাহিদ।
ডা. সেলিনা আক্তার বলেন, গত দুই বছরে দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং নিশ্চিত ও উপসর্গভিত্তিক মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২১৫-এ পৌঁছেছে। তিনি একে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনার আহ্বান না জানিয়ে বলেন, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তিনি পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, হামের কারণে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায় এবং কখনও আক্রান্তদের অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ—একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে এবং লক্ষণ প্রকাশের আগেই এটি ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, টিকাপ্রাপ্ত শিশু এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে।
দেলোয়ার জাহিদ বলেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, টিকা সংগ্রহে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব বর্তমান সংকটকে তীব্র করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত দেশব্যাপী গণটিকাদান জোরদার, টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্টেপ টু হিউম্যানিটির পক্ষ থেকে সংক্রামক রোগ কর্নার চালু, শিশুদের জন্য ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি সংগঠনটি জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করবে।
নারীনেত্রী নাসিমা আক্তার বলেন, গুজব ও ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তিনি স্বাস্থ্যকে মানবাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দারিদ্র্য বা বৈষম্যের কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কামরুল হাসান বলেন, স্বাস্থ্য কেবল একটি সেবা নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। World Health Organization-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার পূর্ণতাই প্রকৃত স্বাস্থ্য। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
সভায় দেলোয়ার জাহিদ বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় হিসেবে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন: ১. জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা ২. ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়স থেকে টিকাদানের নীতিগত বিবেচনা ৩. স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ৪. রিয়েল-টাইম ডাটা মনিটরিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা ৫. গণসচেতনতা ও কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বৃদ্ধি করা
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবুও যদি শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করে, তবে তা কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখনই সময়—দায় স্বীকার, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার।
প্রকৌশলী কোরা হাসান ইভানা কমিউনিটি সংযোগ বৃদ্ধি ও সামাজিক সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দেশের গণমাধ্যমগুলোকে আরো বলিষ্ট ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী কোরা হাসান ইভানা, উদ্যোক্তা, কনসালট্যান্ট (ন্যায্য জ্জ্বালানি রুপান্তর, শিশু সুরক্ষা)
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন