নারী কেন চিরকাল টার্গেট

gbn

ডান–বাম নির্বিশেষে নারীকে ‘বেশ্যা’ বলতে পারলে একটা শ্রেণির অদ্ভুত আনন্দ হয়। ধর্ম–অধর্মের ভান ধরে মহিলাদের নরকে ঠেলে দিয়ে তারা হাফ ছাড়ে। যুগে যুগে নারীদের কেন্দ্র করে এমন অশোভন সম্বোধন আসলে কেন? মেয়েদের টার্গেট করে এই চরিত্রহননের আয়োজন পুরুষকে কি মহৎ করে, নাকি দানবে পরিণত করে?

 

রাজনীতির ময়দানে, মাহফিলের প্যান্ডেলে কিংবা কতিপয় শিক্ষিত শ্রেণির অন্দরমহলে নারীকে নিয়ে যে চর্চা চলে, তাতে সভ্য যুগের বাক্যালাপ থাকে না। সেখানে নারী হয়ে ওঠে ভোগের বস্তু, চোখের কাম। যুগে যুগে নারীদের নিয়ে অশ্লীল উচ্চারণ করে ভোটের বাক্স ভরা যায়, কথিত ধার্মিকদের মন পাওয়া যায়। নারীর শরীরকে বাজারের পণ্য, স্ত্রীজাতির স্বাধীনতাকে নরকের টিকিট এবং মেয়েদের শিক্ষাকে ‘হারাম’ ঘোষণা করতে পারলে দাস–প্রভুর খেলাটা জমে ওঠে। ‘নারী বেশ্যা’— মজমার মাইকে এই ঘোষণার বিনিময়েই আজকাল ভোটের হিস্যা মেলে।

 

যুগে যুগে নারীই কেন টার্গেট? মহিলাদের নিয়ে এই অসভ্য চর্চার আড়ালের যুক্তি কী? নারী আসলে কে? মা–কন্যা, বোন–স্ত্রী— এই চার পরিচয়ের বাইরে পুরুষের চারপাশে কি আর কোনো নারী নেই? সত্য কী জানেন, যারা অন্য নারীদের সম্মান দেখাতে পারে না তারা ঘরের নারীদেরকেও ইজ্জত দিতে জানে না। যে নারীর শাড়ি খুলে তাকে বেশ্যা প্রমাণ করতে চায়, সে নারী তো ঘরের লক্ষ্মী। মস্তিষ্কের বিকৃতি ছাড়া নারীকে আক্রমণ, হেনস্তা কিংবা উত্যক্ত করা— মায়ের জঠরে জন্ম নেওয়া কোনো পুরুষের সাজে?

 

সভ্যতার এই আলোতেও যারা ভোটের মাঠে, ধর্মের হাটে কিংবা সমাজের দোহাই দিয়ে নারীদের কোণঠাসা করে রাখার অপচেষ্টা চালায়, তারা মানুষের মাপকাঠিতে কোন স্তরের? দুর্ভাগ্য ও দুর্ভাবনার বিষয় হলো— এদেরও অনুসরণকারী একটি শ্রেণি আছে; যারা নারী নিয়ে বাজে কথা হলে কান খাড়া করে শোনে। এতে পাশবিক আনন্দ পায়। 

 

নারীর শরীর ঘিরে বর্বরোচিত উল্লাসকারী এবং তাদের সমর্থনকারীরা শয়তানের চেয়েও নিকৃষ্ট। যাদের জিহ্বার দ্বারা নারী নিরাপদ নয়, তাদের মস্তিষ্ক যেন ক্যান্সারে আক্রান্ত। পথে–ঘাটে যারা মা–বোনদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, যারা নারীদের জন্য এখনো ভয়ের সমাজ তৈরি করে রেখেছে এবং যাদের আতঙ্কে নারীদের তটস্থ থাকতে হয়— সমাজে তাদের সংখ্যা অল্প নয়।

 

নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, নারীর অনিরাপদ পৃথিবীর জন্য দায়ী কেবল পুরুষ নয়; নারীও। কখনো কখনো সেই তালিকায় মা–বোনও থাকে। যে ঘর কন্যাকে স্বাধীনতা দেয় না, যে আপনজনের কাছে নিরাপদ নয়— দুনিয়ায় তার পথচলা পিচ্ছিল হবেই। সন্তানকে যখন শেখানো হয়—  ‘তুই মেয়ে, চুপ থাক’, ‘মেয়েদের প্রতিবাদে কাজ নেই’, ‘মেয়েদের এত বুঝতে নেই, এত বলতে নেই’— তখন আসলে একটি ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করা হয়।

 

সাম্প্রতিক পক্ষ–বিপক্ষের রাজনীতিতে উদ্দেশ্যহীন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রসূতভাবে নারীদের টার্গেট করে কিছু অযাচিত শব্দের উচ্চারণ চলছে। এসব শব্দ নারীদের জন্য যেমন অবমাননাকর, তেমনি শিক্ষা ও সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ঘৃণাভরে এসব শব্দের প্রণেতা এবং এসবে বিশ্বাস পোষণকারীদের প্রত্যাখ্যান করা উচিত। পোশাক মেপে যারা সন্ন্যাসী ও বেশ্যার শ্রেণিকরণ করে, তারা সমাজের জন্য ভয়ানক হুমকি। তারা আবার দায়িত্বশীল হলে দেশ কোথায় যাবে?

 

মসজিদ–মন্দিরের মাইক, মাহফিল–রাজনীতির মঞ্চ এবং আড্ডা–গল্পের কেন্দ্র— যেখানে যেখানে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেসব আয়োজন সরব প্রতিবাদে বন্ধ করে দিতে হবে। প্রতিবাদে যারা নিজেদের দুর্বল মনে করে, তারা অসভ্যদের বয়কটের পথ বেছে নিতে পারে।

 

নারীকে হেয় জ্ঞান করে, অশালীন আস্ফালনে এবং নরকের প্রতীক বানিয়ে যারা মানসিক মজা লোটে— তাদের সার্বিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। কোনো অচেনা নারীকে অসম্মান করা মানে দুনিয়ার কোনো না কোনো সন্তানের মা, কারো না কারো স্ত্রীকে অসম্মান করা। আমাদের চারপাশে যারা নারীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, নারী নিয়ে আপত্তিকর আলাপে মাতে, চোখ দিয়ে নারীকে মাপে এবং নারীকে কেবল বিছানার বস্তু ভাবে— তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

 

নারীকেন্দ্রিক অসম্মান যারা জিইয়ে রাখে, সেই পশুদের কপালে দানবের সিল সেঁটে দিতে হবে। আমরা সম্মিলিতভাবে যদি নারীদের অসম্মানকারীদের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হই, তবে মানবজনমে অর্জিত সব সুশিক্ষাই দৃষ্টিহীন হয়ে পড়বে। সভ্যতার এই আলোতে আমরা যেন অন্ধকারের দিকে না হাঁটি। আমরাই যদি অন্ধকার হই তবে আলোর পিদিম জ্বালানোর দায়িত্ব নেবে কে?

 

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।  

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন