মৌলভীবাজারে জলমহাল দখল করে মাছ শিকার

672
gb
ওমর ফারুক নাঈম, মৌলভীবাজার:: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার সরকারি জলমহাল ‘শালকাটুয়া’ ও ‘মাঝের বান্ধ (বদ্ধ)’র মালিকানা দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে মাছ শিকার করছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলার বিএনপির সাবেক সম্পাদক ফজলুল হক নিরু। জলমহল লিজ নেওয়া ছাড়া অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ করে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এ নিয়ে এলাকাবাসী দফায় দফায় জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। সরেজমিনে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

লিজ ছাড়াই মাছ শিকারের বিরুদ্ধে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শাহ মুরাদ মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবুল হাসান ও সম্পাদক পিন্টু সুলতান মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা না হওয়ায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পিন্টু সুলতান পুনরায় জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দেন। বিভিন্ন মৎস্যজীবী সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শালকাটুয়া ও মাঝের বান্ধ (বদ্ধ) জলমহাল দুটি বাংলা ১৪১৭-২২ সালে ৬ বছরের জন্য গোলাপ ও বেতাউঞ্জ মৎস্যজীবী সমিতি প্রায় ১২ লাখ টাকা রাজস্ব প্রদান করে ইজারা গ্রহণ করে। তার আগের বছর ১৪১৬ বঙ্গাব্দে প্রায় ৫ লাখ টাকায় এক বছর মেয়াদে লিজ নেয় যুগান্তর মৎস্যজীবী সমিতি।

গতকাল বুধবার জেলার রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরে পাঁচগাঁও ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় ‘ঘরি জাল’ দিয়ে মাছ শিকার করছেন কয়েকজন। তাদের মাছ শিকারের নির্দেশ কে দিয়েছে? তা জিজ্ঞেস করে উত্তর পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয়রা জানান, সেখানে এলাকার কেউ মাছ ধরছেন না। উপজেলা বিএনপির সাবেক নেতা ফজলুল হক নিরুর লোকজন এই মাছ শিকার করছে। শাহ মুরাদ মৎস্যজীবী সমিতির দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার সরকারি জলমহল ‘শালকাটুয়া’ ও ‘মাঝের বান্ধ (বদ্ধ)’ হাইকোর্টের বিভিন্ন রিট পিটিশন মোকাদ্দমার রায়ের আলোকে ‘শাহ মুরাদ মৎস্যজীবী সমিতি তিন বছর মেয়াদে জলমহল ইজারা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। এর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা চেয়ে গত ১০ ডিসেম্বর (স্বারক নং ১৬৩৫ ও ১৬৩৮) ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংগঠনটি। এদিকে কয়েক মাস যাবৎ জলমহল দুটির ‘ভুয়া কাগজপত্র’ তৈরি করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মৎস্য আহরণ করে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করছে।

অভিযোগ সূত্র ও অনুসন্ধানের জানা যায়, জলমহলে মাছ শিকারে গড়ে ওঠা অবৈধ চক্রটির মূল হোতা রাজনগর উপজেলার খারাপাড়া এলাকার ফজলুল হক নিরু। এ ছাড়াও এ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, রক্তা এলাকার লুৎফুর রহমান, বাবর মিয়া, আবদুল হাকিম, চায়না, আকমল, আজমল, তাজমল, আক্তার, রুমেল ও সুলতানসহ ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, দখলদার চক্রের কার্যক্রমে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে শতাধিক স্থানীয় সাক্ষী পাওয়া যাবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দিন দিন বেপারোয়া হয়ে উঠছে তারা।

শাহ মুরাদ মৎস্যজীবী সমিতির সম্পাদক ও অভিযোগকারী পিন্টু সুলতান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধানী থাকা অবস্থায় ফজলুল হক নিরুর নেতৃত্বে একটি চক্র জলমহল দুটি আত্মসাৎ করে আসছে। সেই সঙ্গে শালকাটুয়া বিলের নয়াকাল নামক স্থানে বাঁধ কেটে ঘরি জাল দিয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ অবৈধভাবে আহরণ করছে। আমরা দফায় দফায় ডিসির কাছে অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

পাঁচগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুর নূর আহমদ আজাদ বলেন, এটা ডিসি অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। অভিযুক্ত ফজলুল হক নিরু অবৈধভাবে মাছ শিকারের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এবার জনগণ বিল থেকে মাছ আহরণ করছে। কতিপয় লোক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, দুটি বিল নিয়ে মামলা চলছে। এটা নিয়ে জেলা জলমহাল বন্দবস্ত ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন আমরা তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। অবৈধভাবে মাছ শিকার বিষয়ে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মোবাইল কোর্ট ও পুলিশের মাধ্যমে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।