গ্রীণকার্ড ছাড়া নিউইয়র্কে বাসা ভাড়া মিলছে না!

377
gb

হাকিকুল ইসলাম খোকন,হেলাল মাহমুদ  যুক্তরাষ্ট্রে ||

আবদুল আজিজ। কক্সবাজারের একটি  ব্যাংকে চাকুরি করতেন। দু‘মাস আগে পাড়ি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আছেন জ্যামাইকার এক আত্মীয়েরবাড়ীতে। এক মাস ধরে বাসা খুঁজছেন। ইচ্ছা তার এ্যাপার্টমেন্টে বাসা ভাড়া নেয়ার। ইতোমধ্যে সোস্যাল এবং ষ্টেট আইডি পেয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি বাসার জন্য গিয়েছিলেন জ্যামাইকার অতি পরিচিত একটি
এ্যাপার্টমেন্টে। ম্যানেজারের কাছে বাসা ভাড়া চাওয়ার পর জানতে চাইলেন,‘ ট্যাক্স ফাইল করা আছে কি
না’? আবদুল আজিজ না বলার সঙ্গে সঙ্গেই ম্যানেজার বললেন, ‘আপনি বাসা ভাড়া পাবেন না। এক বেড
রুমের বাসার জন্য ৩৬ হাজার টাকার ট্যাক্স ফাইল লাগবে।’ নতুন অভিবাসী আবদুল আজিজ বাসা ভাড়া
নিতে গিয়ে প্রথমে যে ধাক্কা খেলেন তাতে স্বপ্নের আমেরিকা নিয়ে তার ভাবনা শুরু হয়েছে। এর পর আবদুল

আজিজ নিকটস্থ মসজিদের এক মুসল্লির সহায়তায় জ্যামাইকার ১৪৩ স্টিটের একটি প্রাইভেট বাসায় গেলেন
ভাড়া নিতে। এক বেড় রুমের বাসা দু‘দলায়। ভাড়া ১৪শ ডলার।
সবঠিক হওয়ার পর বাড়ির মালিক বললেন, ‘গ্রীণ কার্ড ছাড়া তিনি ভাড়া দেবেন না’। ডলার এডভান্সড
দিয়ে বাসায় গিয়ে গ্রীণ কার্ড দেখানোর পর বাসা ভাড়ার বিষয়টি চুড়ান্ত হয়। বিষয়টি জানার পর
বাংলাদেশি ওই বাড়ীর মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না
করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা আগে পরিচিত মুখ দেখলেই ভাড়া দিতাম। ব্রুকলিনে আমার এক
মামাতো বোন কাগজপত্র, বিশেষ করে গ্রীণ কার্ড না দেখে ভাড়া দিয়ে বিপদে পড়েছেন। সে থেকেই আমরা
সিদ্ধান্ত নিয়েছি গ্রীণকার্ড না থাকলে ভাড়া দেব না। শুধু গ্রীণকার্ড এবং কাগজপত্র দেখে ভাড়া দেব বলে এক
মাস বাসা খালি রেখেছি।’ এদিকে গ্রীণকার্ড দেখিয়ে বাড়ী ভাড়া পাওয়া গেলেও বাসা ভাড়া নিউইয়র্কে
লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক সিটির বড় বড় এ্যাপার্টমেন্টের
মালিকদের বিরুদ্ধে এফর্ডেবল হাউজ অবৈধভাবে ভাড়া দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের
অভিযোগ উঠার পর সিটির পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার কুইন্সের ব্রারুডে একটি সভা করা হয়েছে। সভাটি
হওয়ার আগে এলাকায় বসবাসকারী সবাইকে নোটিশ দিয়ে জানানো হয়।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘আপনি যদি এফর্ডেবল হাউজ’ থেকে কোন ধরনের অবৈধ আচরণের শিকার
হন বা মালিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভাড়া দিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের বৈঠকে তা উত্থাপন করুন।’
ব্রারুডের ১৩৫ এভিন্যুতে বসবাসরত মারিওলা যোগ দিয়েছিলেন এ সভায়। তিনি এ প্রতিবেদকে বলেন,
‘আমরা সিটির প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছি। এ সময় অন্তত ৬ জন নারী পুরুষ এ ধরনের অভিযোগ
করেছেন। সিটির কর্মকর্তারা সে অভিযোগ গ্রহণ করেছেন।’ সভায় এ বিষয়ে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার
ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এদিকে বাড়ীর সামনে ‘টু-লেট’ সাইন ঝুলানোর পরও এশিয়ান বা কালোবর্ণের কেউ গেলে অনেকে
বাড়ীভাড়া দিতে প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে সোস্যাল জাষ্টিস কমিশনে কয়েকশত
অভিযোগ জমা পড়েছে।
জ্যামাইকায় বসবাসরত বাংলাদেশি ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাড়ী ভাড়া বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে
তা হতে হবে একটা নীতিমালার মধ্যে। অতীতে এই বৃদ্ধির হার সহনীয় হলেও এখন কেউ নিয়মের তোয়াক্কা
করছে না। এতে একদিকে যেমন বাড়ী ভাড়া দিতে ভাড়াটিয়াদের নাভিশ্বাস উঠছে অপর দিকে বাসা
মালিকদের সাথেও দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে।
নিউইয়র্কেও এস্টোরিয়া, জ্যামাইকা, ওজনপার্ক, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসে বাড়ী ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র একই। তবে
কুইন্সের পর ব্রুকলীনে এই বৃদ্ধির হার বেশি। ব্রঙ্কসে বৃদ্ধির হার তুলনামুলকভাবে কম। ভুক্তভোগীরা
জানান নিউইয়র্কে লোক সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে সেভাবে বাসা বাড়ী বাড়ছেনা। ফলে বাড়ী বা এ্যাপার্টমেন্ট
মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে।
ওজোন পার্কে বসবাসরত বাংলাদেশি নুরুল ইসলাম বলেন, এক থেকে দুই বছর আগে এলাকাভেদে যেখানে
৯ থেকে ১১শ ডলারে ১ বেড রুমের বাড়া ভাড়া পাওয়া যেতো। এখন সেজন্য গুনতে হচ্ছে ১৩ শত থেকে
১৬শত ডলার। আমি ভাড়া দিতে রাজী আছি কিন্তু মালিক গ্রীণ কার্ড, সোস্যালসহ সব কাজগপত্র চাইছে।
আমি গ্রীণ কার্ড এবং সোস্যাল দিয়ে কেন বাড়ী ভাড়া নেব? আমার কাছে তো ষ্টেড আইডি আছে।
কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায় বাসাভাড়া বৃদ্ধির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এস্টোরিয়া। এলাকাটি ম্যানহাটন সংলগ্ন বলে
বাড়ী বা এ্যাপার্টমেন্ট মালিকরা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ী ভাড়া বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ৩৬
এভিনিউ এর একটি ১ বেড রুমের বাসা ভাড়া ১৯শ ডলার বলে একজন বাংলাদেশি জানান।
জ্যামাইকাতে বসবাসরত একটি রেস্তোরায় কর্মরত বাংলাদেশি নজির আহমদ আহমদ বলেন, আমি ১২
বছর আগে এস্টোরিয়ার ৩৬ স্ট্রিটে ছিলাম। তখন ১ বেডরুমের একটি বাসা ভাড়া দিতাম ৭২০ ডলার।
দশ বছরে বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ১৯শ ডলারে।

তিনি বলেন, দিনরাত পরিশ্রম করে যে অর্থ রোজগার করি তার দুই তৃতীয়াংশই চলে যায় বাড়ী ভাড়ায়।
সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয় কখনো বাড়ী ওয়ালা কখনো বা ম্যানেজমেন্ট বা সুপারের জন্য। বাসা ভাড়া
দিতে একটু বিলম্ব হলে রাতের ঘুম হারাম করে দেয়।