আমার স্মৃতির পাতায়

103
gb
4

“আমার স্মৃতির পাতায় ”
আমার শৈশবের একটা গল্প বলি ।যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ।ডায়লগ ছিল “আমি তোমাকে হত্যা করিব “।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি ।আমরা সাত ভাই বোন ,দুই দিদি যমজ ।সকলের সাথে যেমন খুনসুটি তেমনি মারপিট ।বিশেষ করে সন্ধ্যা বেলায় ।কারন আমাদের তখন ও ইলেকট্রিক পৌছোয়নি।হারিকেন নিয়ে যতো ঝামেলা । আমাদের পাড়ায় দূর্গা পুজো হতো তার পর কিম্বা সম্ভবতঃ ডিসেম্বর মাসে সকলের পরীক্ষা শেষ রেজাল্টের অপেক্ষায় ঠিক সেই সময়ে পাড়ায় এক দল লোক রাম যাত্রা করতে আসতেন ।এবং রাম যাত্রার শেষ দিনে আমার বাবার বন্ধুরা মিলে একটা যাত্রা করতো । তার আগে বলি আমাদের বাড়ীতে বাবার এক বন্ধু মাঝে মাঝে আসতেন দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী ।উনি খুব ভালো অভিনয় করতেন এবং খুব ভালো মানুষ ছিলেন । আমি সুন্দর কাকু বলে ডাকতাম ।,কাকু দেখতে খুব সুন্দর ছিলো বলে ।আর সবাই দেবু কাকু বলে ডাকতো ।উনি সিনেমায় ও অভিনয় করেছেন ।ওনার দিদিও অভিনেত্রী ছিলেন ।আমার বাবা সেই সময় শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করতেন ( আমারা বাবাকে বাবু বলে ডাকতাম )এছাড়া বাবুর আর এক বন্ধু প্রখ্যাত শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্রের গানও করতেন ,খুব ভালো ছবি আঁকতেন ,নাটক ও যাত্রার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ছিল ।যার জন্য বাবু আমাদের ভাই বোনেদের খুব উৎসাহ দিতেন ।যার জন্য সকলেরই কিছু না কিছু শিলপীর ছোঁয়া রয়েছে ।যাই হোক যাত্রার দিনে আমরা সবাই মিলে যাত্রা দেখতে যেতাম ,আমার মা ,কাকিমা ও কাকার দুই ছেলে এক মেয়ে এমনকি আমাদের বাড়ীতে যে ছেলেটি সব সময় থাকতো ফাইফরমাস খাটতো মোহন সেও যেত ।ঠাকুরমা ঘর পাহারা দিতো। আমাদের তিন মাথার মোড়ে যাত্রা্র মঞ্চ হতো আর তার কিছুটা দুরে সাজ ঘর হতো।আমরা দেখতাম সকালবেলা কতক গুলো লোক আসতো যারা কিনা রাম যাত্রা করবে ,কয়েকটা ট্রাঙ্ক আর লাঠি সোটা এই সব নিয়ে ঐ সাজ ঘরে ঢোকাতো ।সারা দিন ভাই বোনেদের একটা উচছাস ছিল কখন যাবে রাম যাত্রা দেখতে ।সন্ধ্যা বেলায় যখন যাত্রা শুরু হবে তার আগে আমরা পৌছে যেতাম ,আগে বসবো বলে ।আমরা চটে বসতাম আর মা কাকিমারা বসতো চেয়ারে ।বেশ মনে আছে কাঠের ফোল্ড করা চেয়ারে ।মোহন ও আমাদের সাথে যেত মায়েদের জায়গা রাখার জন্য ।বসে আছি ,বসে আছি অপেক্ষায় কখন আরম্ভ হবে হঠাৎ দেখি আমার দাদা ,,ওই সাজ ঘরে পর্দার আড়ালে উঁকি মেরে কি দেখছে ,আমারও কৌতূহল হলো আমিও দৌড়ে গিয়ে দেখি এক মহিলা গেরুয়া শাড়ি পরা কপালে লাল টিপ চুল ছাড়া হাতে আর গলায় রুদরাক্ষের মালা পরে বসে বসে বিড়ি খাচ্ছে ,আমি ঐ দেখে ছুটে এসে চিৎকার করে বলছি দিদি , দিদি সীতা না বিড়ি খাচ্ছে ।সেই শুনে সবাই সাজ ঘরে ছুঁচলো ।এমন সময় রাবন যে সেজে ছিলো সে বাইরে এসে এক বকা লাগলো চুপ করে না বসলে সব বন্ধ করে দেব ।সবাই তো ভয়ে যে যার জায়গায় এসে বসালো ।যাই হোক শেষ মেষ শুরু হলো ।যখন সীতা মঞ্চে প্রবেশ করলো তখন আমি আবার আমার দিদিকে দেখালাম ঐ যে সীতা হয়েছে উনি বিড়ি খেয়েছে জানিস ।মেয়েরা আবার বিড়ি খায় বল ? ।অমনি দিদি এক ধমক দিয়ে বললো চুপ কর নইলে এখান থেকে বের করে দেবে ।ও মেয়ে নয় ও ছেলে তাই বিড়ি খেয়েছে এবার চুপ করে দেখ ।।যাত্রা পালা “সীতা হরন” সে দিন কার মতো তো শেষ হলো । তৃতীয়দিন রাম যাত্রার শেষ দিনের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে যারা রাম যাত্রা দেখেছেন , তারা জানবেন সেটা হলো মালা ডাক 10টাকা থেকে ডাকা শুরু হয় তার পর যে যতটা সামর্থ হয় মালাটি কেনেন ।যারা যাত্রা করেন তাদের ঐ টিই রোজগার ।যাই হোক সে দিন আমার বাবুকে দেখলাম 200টাকা দিয়ে মালা কিনলেন ।তখনকার দিনে দুশো টাকা মানে অনেকটা টাকা।আমার বাবু একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাদার ছিলেন বলেই সম্ভব হয়ে ছিল ।এর মধ্যে বলি যাত্রা দেখে এসে পর দিন বাড়ীতে ভাই বোনেরা ওদের ভালো লাগা অংশ গুলো করতো ।এবার চতুর্থ দিনের কথা বলি আমার বাবু কাকুরা মিলে যে যাত্রাটি করবে তার ডিরেকটর ছিল সুন্দর কাকু ।যাত্রা নামটা আমার সঠিক মনে নেই তবে বাবা সাঁওতালদের মোড়লের পাঠ করে ছিল ।বাবুকে বেশ মানিয়ে ছিলো । মাথায় পালক কানে বড়ো বড়ো লাল দুল গলায় বড়ো বড়ো পুথীর হার তখন আর সে রকম ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিলো না আজ মনে হয় ছবি তোলা থাকলে ভালো হতো দেখতে পারতাম পুরোনো স্মৃতি ।এবার আসি যার জন্য এই স্মৃতি মন্থন ।আমরা ছোটরা সব সময় বড়দের নকল করি ।নাটকের কোন এক জায়গায় আমার বাবু আর দেবু কাকু একটি দৃশ্য ছিল বাবু লাঠি আর দেবু কাকু তলোয়ার নিয়ে একটা যুদ্ধ ক্ষেত্রে ,ডায়লগ ছিল ,আমি তোমাকে হত্যা করিব ।বলে উদ্ধত হয় ।পর দিন সকালে এই অংশটি নকল করে ছিল আমার কাকার বড়ো ছেলে ধ্রুব আর মোহন ,আমাদের বাড়ীতে যে ছেলেটি থাকে ।আমাদের বাড়ীতে সে দিন দেবু কাকুর পরিবারকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ।সে দিন বাবু সকাল সকাল বেড়িয়ে গিয়েছিল একটা বিশেষ কাজে ।আর মোহনকে বলে ছিল তিনটে দেশী মুরগী কাটবি ।আমাদের বাড়ীতে তখন বয়লার মুরগী কেউ তেমন পছন্দ করতো না ।”মা “মোহনকে ছুড়িটা দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কেটে নিয়ে আয় মোহন ছুড়িটা নিয়ে(12″লম্বা আর চওড়া 2″)ছাদে গেলো ।এমন সময় আমার কাকার ছেলে ধ্রুব মোহনকে বলল চল আমরা কালকের মতো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলি।আমি তখন ঠাকুর ঘরে ছিলাম ,ওদের ঠক ঠক শব্দে ওদের কাছে এলাম ।দেখি ওরা খেলছে ।ধ্রুবর হাতে লাঠি আর মোহনের হাতে ছুড়ি।এই মোহন তোকে না মুরগী কাটতে বলল আর তুই এই ধার ছুড়ি নিয়ে খেলছি লেগে যাবে না ।দারা তোদের কে খেলা বার করছি ।মা কে” বলছি ,যেই না বলা মুহুর্তের মধ্যে ওরা খেলা বন্ধ করবার জন্য ওই ডায়লগটা বলে উঠলো ,”আমি তোমাকে হত্যা করিব” ,তারমধ্যে খেলা শেষ মোহন তার পায়ের হাটুর নীচের মাংস পেশিতে ছুড়িটা ঢুকিয়ে এফোড় ওফোড় করে ফেলেছে ।সাথে সাথে রক্ত ঝরছে ,আমি ঐ দেখে চিৎকার করে মাকে” ডাকছি মা তুমি শিগগিরি এসো মোহন পা কেটে ফেলেছে ।মা ” রান্না ঘর থেকে দৌড়ে এলো ওপরে আর কাকার ছেলে ভয়তে বলতে বলতে পালাচ্ছে আমি কিছু করি নি জেঠিমা ,আমি কিছু করিনি । সে তো পালিয়ে সারাদিন পিসির বাড়ী কাটালো ।এদিকে মা এসে মোহন কে দেখে বলল কি করে হলো,কি করেছিস? ও তো মাকে দেখে আরো কান্না ।মা কে” সে দিন দেখেছিলাম মায়ের কি সাহস মুহুর্তের মধ্যে মা” ছুড়িটা বার করলো এদিকে রক্তে রক্ত।মা” দু হাত দিয়ে চেপে ধরে থাকলো ।আর আমায় বলল যা তো একটু কপার আর দেশলাই টা নিয়ে আয় ।এই শুনে আরো কান্না ।আমাকে পুড়িয়ে মেরো না ।আগেকার মানুষ কেটে ছোড়ে গেলে এই টিটমেনট গুলো করেই ভালো হতো ।তার পর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো এ দিকে ঠাকুমা আর কাকিমা মিলে রান্না ঘর সামাল দিল ।আর মুরগী কেটে ছিল বাবুর আর এক কর্মচারী।অবশেষে মা” মাংস টা রান্না করে ছিলো ।এই ছিল সে দিনকার যুদ্ধ । সে দিনকার ধারালো অস্ত্রে মোহনের পা কেটেছিল আবার কদিন বাদেশুকিয়ে গিয়েছিল ।
কিন্তু ,এ কোন যুদ্ধ , আজ এ কোন যুদ্ধে দাঁড়িরয়েছি
যা নীরবে, নিঃশব্দে অকালে প্রান গুলো ঝড়ে পরছে , ,,,,,,,,,,,
আজ পৃথিবী নিস্তব্ধ নিরব ।চারিদিকে শুনশান ,নেই কোন কোলাহল ,আতঙ্কে কাটছে মানুষ ,বাঁচার তাগিদে মানুষ গৃহ বন্দী।এই এক মাত্র উপায় বেঁচে থাকার ।
হে পৃথিবী এক ফিরে তাকাও আজ মানুষ বড় কাঁদছে ,,,,,,,,,কফিনে বন্দী হচ্ছে শ থেকে হাজার ,হাজার থেকে লাখ লাখ ,
হে পৃথিবী মানুষ যে আজ অসহায় ,,,,,
বার বার শুনেছি 20শে20 শে বিষ ক্ষয় ,আজও তার পুনরাবৃত্তি।
দীর্ঘ সভ্যতার অপেক্ষায় যেমন এসেছিল মানুষ সভ্যতা ।দীর্ঘ রাতের অপেক্ষার পর আসে নতুন সকাল ।কিন্তু আজ আমরা কিসের অপেক্ষায় ,,,,,,,,,,,

লেখিকা : Juthika Sen . ✍️

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন তবে আপনি চাইলে অপ্ট-আউট করতে পারেন Accept আরও পড়ুন