ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশ

625
gb

আবু জাফর মাহমুদ ||
রাখাইন রাজ্য খালি করে রোহিঙ্গাদেরকে ভারতে পুশ ইন করার সিদ্ধান্ত ছিলো চীন-মিয়ানমার সরকারে।
বেগতিক দেখে চীনে মিয়ানমারের কাছে বাংলাদেশের প্রস্তাব দেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
শেখ হাসিনা সরকার ভারতের অনুগত থাকায় এই সিদ্ধান্ত কার্যকরে মোদী সরকারেরসমস্যা হয়নি।দূর্বল বাংলাদেশকে স্থায়ী চাপের মধ্যে ফেলায় বাংলাদেশ সরকার রাজী হয়ে যাওয়ায় দিরিদ্র বাংলাদেশ আরো গরীব হবার দায় কাঁধে নিলো।ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশ হলো ভুক্তভোগী।

এই চাপ বাংলাদেশের উপর এনে সরকারের উপরের পর্যায়ে লোভ লাভ থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থা দুর্বিসহ হয়ে উঠছে দিনের পর দিন।রোহিঙ্গাদেরকে সরিয়ে নিতে জাতিসংঘের বক্তব্য ও বিবৃতি বর্বরতার বিরুদ্ধে মনোযোগ নিঃসন্দেহে।তবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ফেরত নিতেবাংলাদেশ থেকে তাগিদ না থাকায় বাংলাদেশী সাধারণ মানুষদের ক্ষোভ বিক্ষোভের আশু কোন ফল আসছেনা।

রাখাইনে সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন সচক্ষে দেখতে মিয়ানমারের নেতা অং সান সুচির প্রতি ২৬সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আহবান জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাত বিশেষজ্ঞ। জাতিসংঘেরমানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএন এইচ সি আর)এক বিবৃতিতে  তারা এই আহবান জানান।একই সাথে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করার জন্যে জাতিসংঘের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে সই করেন যথাক্রমে; ১)মিয়ানমারে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিস্থিতি –সংক্রান্ত বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি,২) সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ দূত  ফার্নান্ড ডে ভেরেনেস,৩)গৃহায়ন ও জীবন যাত্রা বিষয়ক দূত লেইলানি ফারহা,৪) আভ্যন্তরীনভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীরমানবাধিকার বিষয়ক দূত সিসিলিয়া জিমেনেজ,৫) সমসাময়িক বর্ণবাদ বিশেষজ্ঞ মুতুমা রূতেরে  ৬) ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত আহমেদ শাহিদ।বিচার বহির্ভূত বা নির্বিচার হত্যাকান্ড সংক্রান্ত বিশেষ দূত এগনেস ক্যালামার্ড।
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদেরকে ভারতে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনাটা  পরিবর্তন হয়ে গেলো।ভারতের অনুগত বাংলাদেশ সরকারকে রাজী   করিয়েই মোদী নিজের ক্ষমতার মেয়াদ হারানো থেকে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হলেন।বাংলাদেশের গলায় ঠেলে দিলেন বিষাক্ত কাঁটার স্তুপ।যেকাঁটা গিলে হজম করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশ রূপান্তর হলো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শরণার্থীর দেশে। যাতে বাংলাদেশের   অর্থনীতি,রাজনীতি,সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা স্থায়ী সমস্যার চাপে থাকে।
চীনা কৌশলগত যুদ্ধের চাপ থেকে বেঁচে গেলো ভারত।চীন প্রভাবিত মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য খালি করতে গিয়ে ভারতকে বিপদে ফেলতে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জেনেই মোদী চীন এবং মিয়ানমার সফর করলেন।এতে ভূটান-চীনা সীমান্তের ডোকলাম থেকে ভারত সরকার তার সৈন্যপ্রত্যাহার করে নিলেন এবং ভারতে মুসলমান বাড়ানো নিয়ে এক বিশাল বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচালেন।কেবল তাতেই শেষ নহে,মিয়ানমারে সাথে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা জড়ানো থেকে রক্ষা পেলেন। চীন-ভারত মিলেদূর্বল বাংলাদেশের দূর্নীতিপরায়ণ সরকারকে “ক্ষমতার মেয়াদ এবংবকশিস”এর বিনিময়ে তাদের ভাষায় আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা করলেন।

মোদীর উপদেশ ছিলো মিয়ানমারে সব মুসলমান রোহিঙ্গাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।তাতে ভারত থেকে মুসলমান তাড়িয়ে দেয়ার জন্যে বা মুসলমানদেরকে হত্যা করার কাজে সুযোগটা বাড়ে।ভারত-মিয়ানমার মিলে রাখাইন রাজ্যে বিশাল“মুসলমান মৃত্যুপুর বা নিধনপুর”সাজানোহয়।ভীতি ছড়িয়ে জীবিতদের মৃতপ্রায় করে দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক পর্যায় পার হওয়া যায়।শত্রুদের মনোবল ভাংতে পারার সফলতা  যেকোন যুদ্ধে বিজয় অনিবার্য্য করে দেয়।সরকার দলীয় নীতির মধ্যে তাই দ্রুত  রোহিঙ্গা বিতাড়নের আদেশ অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে মোদীদের সরকার।
রাখাইন রাজ্যে চীনের জন্যে বিনিয়োগের সুবিধা করে দেয়ায় চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে এবং মিয়ানমারে বিনিয়োগ অনেকগুণ বাড়াবে।এতে বাংলাদেশকে দূর্বল রেখে নিজের পায়ের নীচে বাংলাদেশী সরকার উঠাবসা করাবে।বাস্তবে এখন তা সফল হয়েছে।চীনকেবাংলাদেশ বিমুখ করা সহজ হয়ে গেলো।চীন তার বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাতিল করেছে।উন্নত রাষ্ট্র হবার সম্ভাবনা নিয়ে উত্থান হওয়া বাংলাদেশ তার পথ হারালো তার রাজনীতির চোরাবালির মধ্যে। বাংলাদেশ সরকার বিদেশী ত্রাণ হজম করা নিয়ে রাজনীতিরআতশবাজি করছে।কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের মূল্য হারিয়ে অরাজক পরিবেশ কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।
জাতিসংঘের ত্রাণের অর্থ লুণ্ঠনের বহু মাফিয়া পদ্ধতি থাকে।বড় বড় প্রকল্প দেখিয়ে তহবিলের এনে ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটের পেট মোটা করা।এতে স্থানীয়দের উন্নয়ন সমৃদ্ধির কিছুটা যদি কার্যকর হয়,চিকিৎসা ও শিক্ষার দিকে খরচ করা যায়, তবে পরিস্থিতি মোড় নিবে অঞ্চলেরশান্তির ঐতিহ্যগত ধারায়।এক্ষেত্রে প্রতিরক্ষাবাহিনী কতটুকু সামরিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় খাপ খাইয়ে সামাল দিতে পারে,তার উপর নির্ভর করছে সুফল।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, যথাযথ সুরক্ষা না দেওয়ায় মিয়ানমার থেকে প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অকাতরে মৃত্যু হচ্ছে। এই মৃত্যুর দায় বহন করতে হবে সরকারকে। মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয়, রোহহিঙ্গাদের বাংলাদেশেলালনের সমস্যা এবং এদেরকে সুব্যবস্থাপনায় আনতে ব্যর্থতার ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সামাজিক পরিস্থিতির অবনতিতে বাংলাদেশ ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।জাতিসংঘ এবং অন্যান্যদের আর্থিক ত্রান সহযোগীতায় সাময়িক সামান্য কিছু সেবা হয়তো অসহায় মানুষরা পাচ্ছেন।তবে স্থায়ী দুর্যোগের মধ্যে ঢুকে গেলো বাংলাদেশ।এই বিষয়ে রাজনৈতিক মহলের দায় নেবে কে?নেতারা রাজনীতি করছেন একে অন্যকে হেয় করার প্রতিযগীতায়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী বিপদের বিষয়ে তার জাতিসংঘের ভাষণে বা নিরাপত্তা পরিষদে সামান্যটুকুও প্রসঙ্গতুলতে পারেননি। তার এই দিকে মনোযোগ দেখা যায়নি।
তবে জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপপো গ্ল্যান্ডি বলেছেন,মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্যে মানবিক সাহায্য এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা খুবই জরুরী।তিনি বলেছেন,রোহিংগা মুসলমানরা মানসিক ও দৈহিক ক্ষতির শিকার। তাদের এই ক্ষতি সারানো বা চিকিৎসাকরা আগামী কয়েক বছরেও অনেক কঠিন হবে।তাদের জন্যে উপযুক্ত আবাসিক স্থানের ব্যবস্থা করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২৫ শে আগষ্টের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর হামলায় এই মজলুম জনগোষ্ঠীর লক্ষ মানুষ হতাহত হয়েছে।সাড়ে চার লাখের মতো বাংলাদেশে পালিয়েছে।আরো আসছে প্রতি মূহুর্তে।এই সংগখ্যা ১০লাখ করার পরকল্পনারয়েছে।বাংলাদেশের সীমিত ভৌগোলিক পরিসরে এতো মানুষের আকস্মিক চাপের বিষয়ে দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামান্যও সহযোগীতা দেয়া নেয়ার পরিবেশ দেখা যায়না। হীনমন্যতাকে রাজনীতির নীতিগত বিষয়ে স্থায়ী করার পথ নিয়েছে।তাই জাতিরঐক্যবদ্ধ হবার পথে রাজনৈতিক নেতাদের বর্তমান রাজনীতিই হচ্ছে প্রধান বাধা।
জাতিসংঘ চায় রোহিঙ্গারা আবার ফিরে যাবে।তবে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রথন সারিতে রোহিঙ্গাদের ইস্যু দীর্ঘদিন জিইয়ে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ এবং অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেবার ফাঁদ পাতছে।দেশে মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য এবংসুরক্ষা দেবার জন্যে।লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো সামান্যও রাজনীতি করছেনা মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার জন্যে।বাংলাদেশের কোনভাবেই রোহিঙ্গাদেরকে রোহিঙ্গাদেরকে স্থায়ীভাবে রাখার ব্যবস্থা নেই।এটা প্রতিবেশীরাও জানেন।দুনিয়ার সব দেশের জানা আছে। জাতিসংঘের জানা আছে সবার আগে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশী দেশপ্রেমিক ও বিবেকবান মানুষদেরকে বিশ্বযোগাযোগ বাড়িয়ে যথাযথ যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার কারযযকর রাজনীতি করতে হবে চালু।এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নয়া চিন্তা ও প্রচলিত চিন্তার সংমিশ্রনে পরিবর্তন করতে হবেবাংলাদেশের পরিস্থিতি।তাতে জয়ী হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের জন্যে কোন বিকল্প নেই।

 (লেখক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান)।