কথা না শুনলে ৬৪ টুকরা করে ৬৪ জেলায় পাঠানো হবে, মাথাটা জিরো পয়েন্টে

241
gb

মো:নাসির::
অভিযোগ প্রত্যাহার করে মিডিয়ায় প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে তোকে সপরিবারে মেরে ফেলব। আমার কথা না শুনলে তোকে ৬৪ টুকরা করে ৬৪ জেলায় পাঠানো হবে। তোর মাথাটা রাখা হবে জিরো পয়েন্টে।
যা হয় হবে। রেকর্ড কইরা রাখ। আর আমার সঙ্গে থাকলে কোনো ক্ষতি হবে না। আমিই তোকে শেল্টার দেব।’ বেসরকারি টেলিভিশনের সেই সংবাদ পাঠিকাকে সম্প্রতি এভাবেই হত্যার হুমকি ও অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন ডিএমপি থেকে প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমান।
এদিকে তার নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশের সমস্ত দায় সংবাদ পাঠিকাকে নিতে হবে বলে টেলিফোনে প্রতিদিন হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাধর এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সংবাদ পাঠিকার ছবি বিকৃত করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ প্রতিনিধি: জানান, ডিএমপির সাইবার ইউনিট অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগে উপস্থিত হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
সপরিবারে হত্যার হুমকিতে উদ্বিগ্ন হয়ে বিমানবন্দর থানায় জিডি করতে গেলে চার দিনেও সেটি রেকর্ড হয়নি। এ অবস্থায় হুমকিদাতার নাম গোপন করে সাভার থানায় কৌশলে সংবাদ পাঠিকার ব্যবসায়ী স্বামী সাধারণ ডায়েরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে ডিআইজি মিজানের অব্যাহত হুমকির কারণে কয়েক মাস ধরে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা ঘর থেকেও বের হতে পারছেন না। যে চ্যানেলে সংবাদ পাঠ করতেন নিরাপত্তার অভাবে সেখান থেকেও ছুটি নিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। এ অবস্থায় তিনি জীবনের নিরাপত্তা ও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এদিকে ডিআইজি মিজানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক না রাখলে উল্লিখিত সংবাদ পাঠিকাকে সপরিবারে হত্যার হুমকি সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড এসেছে। অডিওতে কয়েকজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে ডিআইজি মিজানকে নানা ধরনের কটূক্তি করতেও শোনা যায়।
গত ১০ এপ্রিল বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগে সংবাদ পাঠিকা বলেন, পুলিশ সদর দফতরে প্রত্যাহার হওয়া ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান গত ২৯ মার্চ দুপুর অনুমান ২টার দিকে ০১৭৯৪২০২০২০ নম্বর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করে সপরিবারে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
সেই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ গণমাধ্যমের কর্মীদেরও জীবননাশের হুমকি দেয়া হয়। তিনি যদি বাসা থেকে বের হন বা অফিসে যান তাহলে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করারও হুমকি দেন।
এমনকি অশ্লীল ছবি তৈরি করে প্রচারেরও হুমকি দেন ডিআইজি মিজান। ওই হুমকি দেয়ার দিন রাতেই ‘দেশি মাল’ (ইংরেজিতে) নামে একটি ফেসবুক পেজ অ্যাকাউন্টের তথ্য পান তিনি। ফেসবুকের ওই পেজে তার ছবি ও তথ্য দেখতে পান। অভিযোগে ওই লিঙ্কটিও তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে নিরাপত্তাজনিত হুমকি পেয়ে ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর তারিখেও গুলশান থানায় একটি জিডি করেছিলেন। সংবাদ পাঠিকা ধারণা করছেন, তার উত্তরার বাসার তিন নিরাপত্তাকর্মী ডিআইজি মিজানকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে।
অভিযোগে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আমার পরিবারের প্রত্যেকের মুঠোফোনের নম্বর অনুসরণ করা হয়। ইতিপূর্বে আমার স্বামীও এ সংক্রান্ত হুমকি পেয়ে ২২ ফেব্র“য়ারি সাভার থানায় জিডি করেছেন।
এ বিষয়ে ওই সংবাদ পাঠিকা যুগান্তরকে বলেন, ১০ এপ্রিল বিমানবন্দর থানায় উপস্থিত হয়ে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করতে যাই। কিন্তু ওসি অভিযোগে নানা ধরনের অসঙ্গতি তুলে ধরে জিডি না নেয়ার কৌশল করেন।
শেষ পর্যন্ত ওসি বলেন, মামলা করতে হবে। তখন মামলাই করব বলা হলে ওসি বলেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে আমাকে বিদায় করে দেন।
তিনি বলেন, ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে ‘দেশি মাল’ পেজ খুলে আমার ছবি অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগ এনে ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের ডিসির কাছে আবেদন করেছি।
সাইবার অপরাধ সম্পর্কে তথ্য ফরমে সন্দিগ্ধ ব্যক্তির নামের স্থানে মিজানুর রহমানের নাম দেয়া হয়েছে। পুলিশের ওই কর্মকর্তা ছাড়া তার আর কোনো শত্র“ নেই বলেও জানান এ সংবাদ পাঠিকা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিআইজি মিজানকে তো আমি মামা বলে ডাকি। মামাকে তো আমি তুমি সম্বোধন করতেই পারি। এ ছাড়া তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠতা হয়।
সেই সুযোগে তিনি আমাকে জিম্মি করার চেষ্টা করেন। নানাভাবে প্রলোভন দেখান। গাড়ি-বাড়ি দেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব লোভে আমাকে ফেলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত স্বামীকে উল্টাপাল্টা বলে পারিবারিকভাবে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। এটা এখন সহ্য করার মতো নয়।

অডিওতে ভয়ংকর হুংকার :
এদিকে একটি বিশেষ স্থান থেকে বেপরোয়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের হুমকি-ধমকি সংক্রান্ত ফোন কলের বেশ কয়েকটি অডিও পাওয়া যায়। ফোনালাপের অডিওতে ডিআইজি মিজানকে ভয়ংকরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে শোনা যায়।
একটি অডিওতে ডিআইজি মিজান ওই সংবাদ পাঠিকাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোর জামাইরে ঘর থেকে বাইর হতে বল। পোলাপান রেডি আছে। সব রেডি আছে। তোকে মাইরা ফালামু। কোন… পোলা তোরে বাঁচায় আমি দেখুম।
এ সময় ওপাশে অঝোরে কাঁদছেন ওই সংবাদ পাঠিকা। ডিআইজি মিজান বলছেন, যেখানেই যাবি তোর নুড (অশ্লীল) ছবি পাঠানো হবে। তুই আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করছিস।’
এর জবাবে সংবাদ পাঠিকা বলছেন, ‘আমি কিছুই করিনি। আমার ছেলের কসম খাইয়া বলছি, আমি কিছুই করিনি।’ আবার হুমকি দিয়ে মিজান বলেন, ‘শুধু একটু বাসা থেকে বাইর হয়ে দেখ। তুই সাম্বাদিক (সাংবাদিক)… (গালি দিয়ে) বাচ্চাদের বলবি আমি থ্রেট করছি। আমাকে সাসপেন্ড করাইছিস না?’
এরপর… গালি দিয়ে বলেন, ‘তোকে অ্যারেস্ট করতে এখন ভাটারা থানার পুলিশ যাচ্ছে। সার্চ ওয়ারেন্ট হইছে। আসামি তুই আর তোর জামাই। তুই আমার সাথে চ্যালেঞ্জ দিবি? আমার সাথে চ্যালেঞ্জ দিয়ে তুই আমার চাকরি খাইছিস। মিডিয়ায় সবকিছু দিছিস তুই।’
ওপাশ থেকে কেঁদে কেঁদে সংবাদ পাঠিকা বলছেন, ‘আমি কাউকেই কিছু দেইনি।’ এবার ভয়ংকর মিজান বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে তুই উত্তরা ছাড়বি। না হলে তোরে মাইরা ফালামু। যা হয় হবে। রেকর্ড কইরা রাখ।’
এরপর কাঁদতে কাঁদতে সংবাদ পাঠিকা বলছেন, ‘প্লিজ আমাকে মাইরেন না। আমার বাচ্চার জীবনটারে নষ্ট কইরেন না। আমি কিচ্ছু করিনি।’ এরপর ডিআইজি মিজান বলেন, তুই আসিস না কেন, আমি ডাকলে?’ জবাবে সংবাদ পাঠিকা বলেন, ‘আমি মেন্টালি ভালো নেই। খুব অসুস্থ।’
জবাবে মিজান বলেন, ‘তোর জামাইরে বের হতে বল। টুকরা টুকরা করব। আর তোরে করব ৬৪ জেলায় ৬৪ টুকরা।… (প্রকাশযোগ্য নয়)। আমার কথার বাইরে যদি চলস তোকে আমি মাইরা ফালামু।’
এরপর বলেন, ‘এখন তুই আত্মহত্যা করবি। না হলে তোরে মাইরা ফালামু আমি। পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই তোকে বাঁচায়। তোরে পাহারা দিতে ১০টা মোটরসাইকেল থাকবে।
আমার বিরুদ্ধে কথা বলবি-না? জিডি কইরা রাখছি উত্তরা পশ্চিম থানায়। তুই আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লাইক দিবি এ কারণে জিডি কইরা রাখছি।’ এরপর ওপাশ থেকে কেঁদে কেঁদে সংবাদ পাঠিকা বলছেন, ‘আপনার যা কিছু করার করেন। আমি ইকো না।’
এর জবাবে ডিআইজি মিজান বলেন, ‘তা হলে আয়, আমার কাছে আয়।’ এ কথার পর সংবাদ পাঠিকা কেঁদে উঠলে আবারও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘২৮ বছরের চাকরিজীবন ধ্বংস করেছিস।