প্রজাতন্ত্র দিবসে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিজেপি সরকারের

465
gb

আবু জাফর মাহমুদ  ||

ভারতীয় রাজনীতির মূলধারা সাম্প্রদায়িক আক্রমণাত্নক।তাই প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার একই সময় সরকার দলীয় বা সরকারী রাজনীতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কার্যকারিতা ও আনুষ্ঠানিকতা উদযাপনকরেছে উত্তর প্রদেশে।রাজনীতি তার নিজের বৈশিষ্ট্যেই নিজনিজ নীতি কৌশল নির্ধারণ করে,অপরাপর সমাজশক্তির অনুমোদন সেক্ষেত্রে তুচ্ছ হয়ে যায়।এই বাস্তবতা মেনে নেবার মানসিকতাসম্পন্ন হয়েই ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি।
 
প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় জনগণের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে ম্যানহাটনের মাউন্ট সাইনাই হাসপাতালের সেভেন  সেন্টারে ২০৬ নং কক্ষে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কম্পিউটার কম্পোজ করছি।ডান পা’র গোড়ালিতেব্যথার চাপ চলছে ক্যাথারিজেশন হয়েছে বলে।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকের মধ্যে আন্তরিকতার আন্তর্জাতিকতা থাকতেই পারে।আমারও আছে।ভারত আমার প্রতিবেশী রাষ্ট্র।একটা রাষ্ট্রের গৌরববোধে অংশীদারহওয়া সেদেশের  মানুষদের আত্নসম্মানের প্রতি  সম্মান দেয়ার চেতনাগত দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা বলেই আমরা জেনে এসেছি।২৬জানুয়ারী ভারতের ৬৯তমপ্রজাতন্ত্র দিবস।দিনটি শুক্রবার।অনেকবাস্তবকারণে বাংলাদেশীদের মধ্যে ইদানিং ভারতের এসব গৌরব নিয়ে আগ্রহ খুব একটা আর দেখা যায়না।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ কমরেড মুহাম্মদ মুজফফর আহম্মদ অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের একজন ছিলেন।
ভারতীয় কম্যুনিষ্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বেরমানুষটি বাংলাদেশের সন্দ্বীপে জন্মগ্রহন করেন।মাষ্টারদা সূর্য্যসেন সহ অনেক বীরবাঙালি বৃটিশবিরোধী বিদ্রোহে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই করার ইতিহাস রেখে গেছেনতার অনুসারী সেনবংশের কয়েকজন বীরের জন্মস্থানও সন্দ্বীপে। এসব নানা কথা মনে করেই ভারতের ইতিহাসের এই মহান পর্যায়ের স্মরণে আজকের এই রাত্রিযাপন।এই রাত্রিযাপন আমার শরীরের জন্যে বিপজ্জনক জেনেও এই ঝুঁকি আমিনিলাম।  
ভারতে এবারের অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী ১০জন রাষ্ট্রপ্রধানকে বিশেষ অতিথি করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়া,মালয়েশিয়া,ব্রুনাই,  ইন্দোনেশিয়া,মালয়েশিয়া,ব্রুনাই,থাইল্যান্ড ভিয়েতনাম,ফিলিপাইন,সিঙ্গাপুর,মিয়ানমারকম্বোডিয়াএবং লাওসের রাষ্ট্র প্রধানদেরকে আমন্ত্রণ করে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছে।এবারের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ভারতের সামরিক শক্তির পাশাপাশি সংস্কৃতি এবং উন্নয়নের ছবি তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বিশেষ প্যারেড প্রদর্শন করা হয়েছে।
সামরিক বাহিনী,আধা সামরিক বাহিনী,সীমান্ত রক্ষীবাহিনী,উপকূলরক্ষী বাহিনী,ইন্দোতিব্বত সীমান্ত পুলিশ,দিল্লী পুলিশ  জাতীইয় সমর শিক্ষার্থী বাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপেরকুচকাওয়াজ দেখানো হয়েছে এই অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে। এই দিবসের কুচকাওয়াজে প্রেসিডেণ্ট রামনাথ কোবিন্দ সামরিক অভিবাদন গ্রহন করেন।প্রধানমন্ত্রী বিজেপির প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট চিলেন উপস্থিতবিশিষ্টজনদের মধ্যে অন্যতম। 
 
এদিকে ভারতের উত্তর প্রদেশে বিজেপি শাসিত সরকার সাম্প্রাদ্যিক উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোফ আসছে।এতে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছে।মুসলমান হত্যার রাজনীতি কার্যকরের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনেররাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা চলছে।মুসলমানদেরকে সরকারীভাবে দুর্বৃরূপে পরিচিত করিয়ে তাদেরকে খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার  হত্যার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন চলছে।সরকারের গোয়েন্দা সহ সরাকার দলীয় নির্দ্দিষ্ট লোকরানাদরাই গেট এলাকায় রোববার ২৮জানুয়ারী আগুণ ধরিয়ে দেয় বলে জানাগেছে।এসব আগুণের দায় মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের উপর চাপ সৃষ্টির পরিস্থিতি হড়ে তোলা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এই পরিস্থিতিদেখা শোনা করছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
 
এসব গোলযোগপূর্ণ এলাকায় ১৪৪ধারা জারিসহ ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।কথিত দুর্বৃত্তদের উপর নজরদারির জন্যে ড্রোনের সাহায্য নেয়া হচ্ছে।জেলা প্রশাসক আর পি সিং বলেছেন,কয়েকজনকে চিহ্নিতকরা গেছে।ষড়যন্ত্র করেই গোলযোগ করা হচ্ছে।জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যকে বিতর্কিত বলছেন অনেকে।সরকারের রাজনৈতিক কর্মধারার সমর্থনেই তিনি চাকরি করছেন বলে প্রজাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা রক্ষা তাদের দ্বারাসম্ভব হচ্ছেনা।
শুক্রবার প্রজাতন্ত্র দিবসে উত্তর প্রদেশের কাসগঞ্জে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ  অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ কর্মীরা মথুরাবেরেসি মহাসড়কে মোটর সাইকেলে করে তিরঙ্গা যাত্রা’ বের করে।এসময় বাদু নগর এলাকায় উত্তেজকশ্লোগান দেয়াকে কেন্দ্র করে আপত্তি ওবিবাদ শুরু হয়।তার জের ধরে হিন্দু  মুসলিম পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।ব্যস,এতেই হয়ে গেলো উত্তেজনার সূচনা।উত্তেজনা ভাংচুর  অগ্নিসংসংযোগের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরবাইরে চলে যায় বা নিয়ন্ত্রনের বাইরে ঠেলে দেয়া হয়।কারফিউ দেয় সরকার।
 
ঘটনার উৎপত্তি বুঝা যায় সরকারের প্রশাসনের কেউ সত্য কথা বলে দেয়ার পর।কাসগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাকেশ কুমার জানানতিরিঙ্গা যাত্রা বের করতে সরকারের অনুমতি নেয়া হয়নি।বিশ্লেষকরা বলছেনউগ্রহিন্দুত্ববাদীরা রাজনৈতিক সরকারের প্ররোচনা  নির্দ্দেশনায় কর্মসূচী বের করেছেন বিধায় প্রশাসনের অনুমতি নেয়নি।অনুমতি নেয়া হলে তো আর সংঘর্ষ হত্না। সরকারের নীতি নির্ধারকদের দরকার তো মুসলমানদের সাথেএকটা সামান্য সংঘর্ষ,যা দিয়ে তারা রাজনৈতিক  প্রশাসনিক বিদ্বেষ কার্যকর করবার সুযোগ নেবেন।প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে।   
মজার ব্যাপার হচ্ছেহিন্দু অধ্যুষিত ভারতের এই আগুণপথের যাত্রায় অপর রাজনোতিক দলগুলো প্রকাশ্য সরাসরি বাধা দিচ্ছেনা। এই পথে বাধা দিতে পারে আদর্শবাদী দলগুলো।আদর্শ যেহেতু বাজারে পণ্যের দামে ক্রয়বিক্রয় হয়,তাই যেশ জাহান্নামে যাক্‌, রাজনৈতিক ফায়দার দিকেই লক্ষ্য হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রন্থাগার  জনশিক্ষা প্রসার দফতরের মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী প্রতিবাদ করেছেন।তিনি বিদেশী রেডিওকে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “প্রশাসন সক্রিয় দায়িত্ব পালন করলে গোলযোগ  দাঙ্গা হতেইপারেনা।প্রশাসনে সরিষার মধ্যে ভূত থাকলে গোলযোগ বন্ধ হয়না।ওখানকার প্রশাসন হয়তো গোলযোহ বন্ধের চেষ্টা করছেন।যেই কঠোরতা নিয়ম শৃংখলার দরকার সেই পর্যায়ে হয়তো ততোটা তারা করতে পারছেনা।তাইদাঙ্গা থামছেনা। দ্বিমুখী কৌশল থাকলে ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন হবেনা। প্রশাসন সফল হবেনা। এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে প্রশাসনের কঠোরতার অভাবে তিনি সতর্ক করেছেনবলেছেন,আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে একইভাবেগেরুয়া শিবিরের তৎপরতা বাড়ানো চলছে বিজেপির পৃষ্টপোষকতায়।
এদিকে প্রজাতন্ত্র দিবসে দিল্লী বিধান সভার বিতর্ক জমে উঠেছে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন  যুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল বৃটিশ রাজাকারি ভূমিকার বদনামে থাকা বিজেপি এস.এস.আর গোষ্ঠীর মুসলিম-বিদ্বেষী কট্টর মনোভাবেরপ্রকাশের প্রেক্ষিতে। মহীশুর রাজ্যের শাসনকর্তা  বৃটিশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে মৃত্যু বরণকারী টিপু সুলতানের ছবিকে কেন্দ্র করেই উৎপাতের উৎপত্তি শুরু হয়।বিতর্কের এক পর্যায়ে বিধান সভার স্পীকার রাম নিবাসগোয়েল বলেন,গ্যালারিতে টিপু সুলতানের ছবি থাকবে।ভারতের সংবিধানের ১৪৪পৃষ্ঠাতেও মহীশুরের শাসনকর্তা টিপু সুলতানের ছবি আছে।বিজেপি এধরনের নীচ রাজনীতির পরিবর্তে উন্নয়নের রাজনীতি করা উচিৎ।এইপ্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দক্ষতা উন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী অনন্ত কুমার হেগড়ে বলেন টিপু সুওলতান ছিলেন,“নৃশংস হত্যাকারী উম্মাদ  গণধর্ষণকারী
 
এসব বিওতর্কের জবানে  পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট সিনিয়র অধ্যাপক ডঃ গৌতম পাল বলেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে টিপু সুলতানের বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে।বিজেপির এই আচরণে একজন সাধারণনাগরিক হিসেবে আমি লজ্জিত বোধ করছি।মহাত্না গান্ধীর হত্যাকারীরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরোধীতা করতেন।আর তারাই এখন প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
টিপু সুলতান ভারতেরস্বাধীনতা সংগ্রামে ছিলেন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব   
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক অশ্লীলতা গুরুত্ব পেয়েছে।রাষ্ট্রীয় রাজনীতি এই অশ্লীল সাম্প্রদায়িক ধারাকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করছে।তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগীতায় বিজেপিরএই বিজয়কে স্থায়ী বিজয় মনে করার শক্তিশালী যুক্তি নেই।ভারতের এই বিভক্তি ভারতকে দুর্বল ছাড়া শক্তি সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবেনা,হতে পারেনা।
   
লেখক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা যোদ্ধা।