ডেঙ্গুতে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যু ৩০, গতকাল ভর্তি ৩৯০

130

জিবি নিউজ 24 ডেস্ক//

আকবর হোসেন গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডিউটি ডাক্তার আবুল হাশেমের সামনে। বললেন, ‘আমার বাচ্চাটার ডেঙ্গু হয়েছে, দুইটা হাসপাতাল ঘুরে আপনাদের এখানে এলাম, প্লিজ একটা সিটের ব্যবস্থা করেন।’ ডিউটি ডাক্তার তাকালেন পাশের ডিউটি নার্সের দিকে। নার্স এক মুহূর্ত দেরি না করেই মাথা নেড়ে বললেন, ‘কোনো সিট খালি নাই।’ আকবর হোসেনের আবার আকুতি, ‘বেড, কেবিন কিংবা আইসিইউ, যা-ই হোক কিছু একটা দেখেন না!’ ডিউটি নার্স আবারও একইভাবে বললেন, ‘স্যরি, আমাদের কিছু করার নাই, খালি না থাকলে কী করব!’

হতাশ হয়ে বেরিয়ে গেলেন আকবর। কিছুক্ষণের মধ্যে আরেক শিশুকে কোলে নিয়ে ঢুকলেন আরেক বাবা। শিশুটি বেশ উত্ফুল্ল ও হাসি-খুশি। সঙ্গে শিশুটির মাও আছেন। ডা. আবুল হাশেম উঠে গিয়ে শিশুটিকে দেখে বললেন, ‘কই, কোনো জ্বর নাই তো। কে বলছে ওর ডেঙ্গু হয়েছে?’ শিশুর বাবার জবাব, ‘সর্দি পড়ছে, কাশি আছে, তাই নিয়ে এলাম দেখাতে, চারদিকে যেভাবে ডেঙ্গুর ছড়াছড়ি, ভয় পেয়ে ছুটে এলাম।’ ডাক্তার তাঁকে কিছু পরামর্শ দিয়ে বাসায় চলে যেতে বলেন। পরে তিনি তথ্য দিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে আসলেই এখন সবাই দিশাহারা। আমরাও ঠিক থাকতে পারছি না। কয়েক দিন ধরেই এমন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আজ (গতকাল) সকাল ৮টা থেকে এই হাসপাতালে মোট ৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে জরুরি বিভাগের মাধ্যমে। এর মধ্যে ১৩ জন ডেঙ্গু রোগী। সকালে কাউকেই বেড দেওয়া যায়নি। যারা এসেছিল তারা অপেক্ষায় ছিল, দুপুরের পর যে বেড খালি হয়েছে সেগুলো পূরণ করা হয় সকালের অপেক্ষমাণ রোগী থেকে। এরপর যারা আসছে তাদের আর রাখা যাচ্ছে না।’

ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে বের হতেই সিএনজি চালিত অটোরিকশায় এসে নামেন আরেক রোগী। জানতে চাইলে রাজধানীর পান্থপথের একটি বড় নামকরা হাসপাতালের নাম উচ্চারণ করে বলেন, ‘ওই হাসপাতালে গিয়ে ঘুরে এসেছি। তারা কোনো ডেঙ্গু রোগী নাকি ভর্তিই করছে না বেড না থাকার কারণে।’

মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আশিষ চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ কোনো বেড খালি নাই। যাদের সম্ভব হচ্ছে রাখছি, যাদের রাখা সম্ভব হচ্ছে না ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমার এখানে বেশির ভাগই ক্রিটিক্যাল রোগী আসছে।’

ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাগুফা আনোয়ার গতকাল রাত ৮টায় বলেন, ‘এখন থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। আমরা যেখানে পারছি বেডের ব্যবস্থা করে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত মোট ৮২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আমাদের এই হাসপাতালে ভর্তি আছে, যাদের মধ্যে ৪১ জনই শিশু।’

এদিকে গতকাল ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৩০ জন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে। এর পরই ইসলামী ব্যাংক (কাকরাইল) হাসপাতালে ২৪ জন, সালাহউদ্দিন হাসপাতালে ১৭ জন, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৫ জন, ইবনে সিনা হাসপাতালে ১১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে গতকাল ঢাকার ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র সাতটি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ১১৪ জন। বাকি হাসপাতালগুলোতে কোনো রোগী বিকেল পর্যন্ত ভর্তির তথ্য তাদের পাঠানো হয়নি। অন্যদিকে ২৬৪ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার চারটি সরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৩৬ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩০ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪১ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৩৭ জন উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে গতকাল সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৩৯০ জন। চলতি জুলাই মাসের গত ২৬ দিনে ভর্তি হয়েছে সাত হাজার ৫১৩ জন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ৯ হাজার ৬৫৭ জন। এর মধ্যে সাত হাজার ৮০৭ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাকি দুই হাজার ২৪২ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। আর সরকারি হিসাবে মৃত্যু আটজন বলে উল্লেখ করা হলেও বিভিন্ন সূত্রের বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৩০ জনে উঠেছে। সর্বশেষ গত দুই দিনে দুজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দুটি বেসরকারি হাসপাতালে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, আজ (গতকাল) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আর তো জায়গা দিতে পারছি না কোনোভাবেই। সব মিলিয়ে আমার এখানে এখন ভর্তি ডেঙ্গু রোগী আছে ১১৫ জন।’

অন্যদিকে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আমিন আহম্মেদ খান জানান, এখন (গতকাল) ভর্তি আছে ১৩২ জন, এর মধ্যে আজ (গতকাল) ভর্তি হয়েছে ৪১ জন। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সব মিলিয়ে মোট রোগী আছে ৬১২ জন