সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা শিক্ষকতাকে লোভনীয় পেশায় পরিণত করেছি যে কারণে কিছু ব্যক্তি শিক্ষকতায় এসেছেন এবং তারাই যৌন নিপীড়নের মতো অনৈতিক কাজগুলো করছেন—অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

79
সমাজ থাকলে সংকটও থাকবে। কারণ সংকট-সম্ভাবনা নিয়েই সমাজ। আমাদের সমাজেও সংকট আছে, বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে। সবকিছু নিয়েই আমরা চলছি, চলতেও হবে। তবে কিছু অস্বাভাবিক, অনাকাক্সিক্ষত সংকট আমাদের সামনে মাঝেমধ্যে হাজির হয় যা আমরা চাই না। শুধু আমাদের এখানেই নয়, পৃথিবীর সমাজে সমাজে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে অনাকাক্সিক্ষত অনেক ঘটনা ঘটে থাকে, যা কেউ আশা করে না। আশা না করলেও এসব ঘটনা চিরতরে বন্ধ করা যায় না। কিন্তু না চাইলেও সংকট হাজির হয়, মোকাবেলা না করে বসেও থাকা যায় না।
ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলো বলেই প্রতিকার চাইতে নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছিলো। অভিযোগ দায়ের করেছিলো। অভিযোগ তুলে নেওয়ার কথা বললে, তা আমলে নেয়নি নুসরাত ও তার পরিবার। ফলে তাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত সে মারাই গেলো। কী ভয়ংকর ঘটনা। একজন কীভাবে তার সন্তানতুল্য মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের কাজ করতে পারলো? এ ধরনের ঘটনা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে ঘটনানো সম্ভব নয়। আমার দাবি হচ্ছেÑঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং অবশ্যই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। উদাহরণযোগ্য শাস্তি দিতে না পারলে এ ধরনের ঘটনার প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, ব্যক্তি যতো প্রভাবশালীই হোক না কেন। তবে একইসঙ্গে এটাও বলবোÑযেকোনো অপরাধীকে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি হতো তাহলে এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পরও দেশে এতো খুন-খারাবি হতো না। খুন-খারাবি কী বন্ধ হয়েছে? হয়নি। চলছেই। অপরাধ করলে শাস্তি ভোগ করতে হয় জেনেও কেন মানুষ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়? কারণ আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলো অনেকটা আলগা হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে প্রীতির সম্পর্ক নেই। হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা মানুষকে কুপথে নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে মানুষের মধ্যে মায়া-মমতার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে বিবাদ বাড়ছে। শহরে জীবনে পাশাপাশি থাকলেও কেউ কারও খোঁজ-খবর নেয় না। বিশ^াসের জায়গাটা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। আগে যেমন যৌথ পরিবার বেশি ছিলো, এখন অনেকটা কম। যার ফলে সামাজিক বন্ধনগুলো আর আগের মতো থাকছে না। আমার মনে হয়, সামাজিক বন্ধনগুলো আরও জোরালো করতে হবে। মানুষে মানুষে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সিনিয়র-জুনিয়র একে অপরকে সম্মান ও ¯েœহ করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয় উভয়কে সম্মান করে চলতে হবে। শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এসব নেতিবাচক দিকগুলোর পরিবর্তন আনতে হবে। পুলিশ আর মামলা দিয়ে হয়তো আপাতত স্থিমিত করা যাবে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।                              শিক্ষকদের আলাদা করার সুযোগ নেই। তারা এ সমাজেরই মানুষ। শিক্ষক হওয়ার আগে তো তিনি এ সমাজেরই ছিলেন, বসবাস করতেন এখানেই। আমার বিবেচনায়Ñঅন্য পেশার মানুষেরা বাটপারি-চিটারি করলে যে শাস্তি হয়, তার চেয়েও বেশি শাস্তি হওয়া উচিত অনৈতিক কর্মকাÐের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের। একসময় শিক্ষকতা পেশা অত্যন্ত নিরানন্দ ছিলো, তা আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি তুলেছি। সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আন্দোলন করতে গিয়েই শিক্ষকতা পেশাকে আমরা এখন লোভনীয় পেশায় পরিণত করেছি। যে কারণে কিছু লোভী মানুষ এই শিক্ষকতা পেশায় চলে এসেছেন। শিক্ষকতা পেশায় না এলে তারা হয়তো চামড়ার ব্যবসা করতেন বা অন্য কিছু করতেন। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার লোভে পড়ে শিক্ষকতা পেশায় তারা এসেছেন। লোভে পড়েই কিছু ব্যক্তি শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন। লোভে পড়েই ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেন। প্রশ্ন আউটের ঘটনাগুলোতেও লোভী শিক্ষকেরাই জড়িত। মাদ্রাসা শিক্ষক যৌন হয়রানির মতো ঘটনায় জড়িত, এটা আসলে নতুন কিছু নয়। মাদ্রাসাগুলোয় যৌন নিপীড়নের ঘটনা অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। এখন অনেক বেশি প্রকাশ হচ্ছে। মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন যুগে যুগে হয়ে আসছে। যৌন নিপীড়নের একটা উৎকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে এই মাদ্রাসা। বিশেষ করে হাফিজিয়া মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো অনেক বেশি ঘটে। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো যেখানেÑসেখানে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। যে অভিভাবকেরা মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য হুজুরদের কাছে দিয়ে দেন, সেখানে কী হয় সেসবও দেখা দরকার তাদের। অভিভাবকদের আরও খেয়াল রাখা দরকার। মাদ্রাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটিতে যারা রয়েছেন তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। যদি সন্দেহজনক কিছু দেখেন তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আগে যেকোনো অন্যায়-অপরাধের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে আসতো। সেই জায়গাটায় পরির্তন এসেছে, যুগের কারণে। অন্যায়ের প্রতিবাদে মানুষ আগে মানববন্ধন, মিটিং-মিছিল করতো, সেগুলো করার সেই সময় এখন আর নেই তাদের হাতে। ফলে সামাজিক আন্দোলনটা এখন রাস্তা থেকে সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যমে চলে এসেছে। প্রতিদিন মানুষ যেকোনো অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদে হাজার হাজার লেখা, ছবি আপলোড করছে। টাকা দিয়েও এখন মানুষকে রাস্তায় আনা যাবে না। মানুষ এখন প্রতিবাদ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে গেছে। একটা অগ্নিকাÐের পর আরেকটা অগ্নিকাÐ আগেও ঘটেছে, ধর্ষণের ঘটনাও আগে ঘটেছে। কিন্তু আগে এসব মিডিয়ায় এতো হাইলাইটস হতো না। এতো মিডিয়াও তখন ছিলো না। এখন অনেক মিডিয়া। ফলে যেকোনো ঘটনার অনেক কাভারেজ। ঘটনা যখন-তখনই মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সামাজিক আন্দোলন এখন রাস্তা থেকে মূল গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে এসেছে।                 আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের অনেক সফলতা আছে। সব না বলে যদি একটা উদাহরণ দিই তাহলে আমরা দেখবোÑআমাদের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা লাভ আওয়ামী লীগের রাজনীতিরই ফসল। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এর চেয়ে বড় ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগের অর্জনের এই জায়গা কোনোদিন কেউ নিতে পারবে না। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সম্মেলনে আমরা নতুন নেতৃত্ব পেয়েছি। নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগকে এই ৬৮-৬৯ বছরে অনেক চড়াই-উৎরায় পেরুতে হয়েছে। বিভিন্ন সময় এই আওয়ামী লীগকে দ্বিধাবিভক্ত করা হয়েছে বা ভাগ করা হয়েছিলো, তাকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ঠিকই নিজের মতো করে রাজনীতিতে একটা জায়গা করে নিয়েছে। ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একটি অক্ষয় সংগঠন হিসেবে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যারা আসতে পারতেন তাদের ৩ নভেম্বর হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা, বিভক্ত করা, বিভিন্ন রকম অপবাদ জনবিচ্ছিন্ন করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে এলেন। দলের হাল ধরলেন। তারপর থেকেই আসলে আওয়ামী লীগে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিলাম, সেটার পুরোটাই হাতছাড়া হয়ে যায় পচাত্তরের পনেরো আগস্ট। কারণ সেদিন শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বা জাতির জনককেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অর্থ্যাৎ বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। যে আদর্শ, স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছে, ঐতিহাসিকভাবে এর যারা বিরোধিতা করে আসছে ষাটের দশক থেকে সকল অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে পনেরো আগস্টের পর। সেখান থেকে এই দলটিকে মানুষের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে আবার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনার ভ‚মিকা আবারও আওয়ামী লীগকে নতুন প্রজন্মের আধুনিক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছে।
আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। বিভিন্ন সময় বহু ¯্রােত এসে আওয়ামী লীগে মিশে গেছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা, অসম্প্রাদায়িকতা, শাশ্বত বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে এগিয়েছে। কিছু কিছু বিচ্যুতি আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ধরনের ঝাঁপটা এসেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অকৃত্রিম যে অবস্থান যেমনÑঅসম্প্রদায়িক, অগ্রসরমান, প্রগতির চিন্তা-চেতনা ও উন্মুক্ত গণতন্ত্রের বাংলাদেশ সেখানেই ফিরে গেছে।
মন্তব্য
Loading...