স্বাধীনতা তুমি চির উন্নত মম শির

44

বিদেশে বাংলাদেশেকে নিয়ে যদি কেউ নেগেটিভ কিছু বলে কেন যেন মাথা গরম হয়ে যায় যা ঘটেছিল ওয়াশিংটনে আমার একবার। নাম আজিজ, পাকিস্তানি ইংলিশ। আজিজ ফাইজারে কর্মরত, এসেছে লন্ডন থেকে একই কনফারেন্সে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে যে সমস্ত পাক আর্মি অফিসার পরাজয় স্বীকার করে পরবর্তীতে তারা পাকিস্তান আর্মি ছেড়ে পাড়ি জমায় বিশ্বের নানা দেশে। আজিজের বাবা কর্নেল খালিদ তার মধ্যে একজন।

আমি খুব একটা সময় যে তার সঙ্গে ব্যয় করেছি তা নয় তবে ভদ্রতার খাতিরে যতটুকু সম্ভব ততোটুকু করেছি। রাতের ডিনারে হঠাৎ আমার পাশে বসেছে আজিজ। তার কথাবার্তায় মনে হয়েছে সে একটু নেগেটিভ মাইন্ডের। ডিনারে মাছ এবং মুরগী রয়েছে, আমি মাছ অর্ডার দিতেই সে আমাকে বলে বাঙালিরা মাছ ছাড়া অন্যকিছু চেনেনা। আমি বললাম, তোমার কোনো সমস্যা? আমি বেশ বিরক্ত বোধ করছি তার আচরণে, তবুও চেষ্টা করছি not to be rude.

সে গল্প তুললো তার ছাত্রজীবনে কাজ করেছে লন্ডনে এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের রিসেপশন ডেস্কে। রেস্টুরেন্টের নাম জয়বাংলা। যখন কেউ টেবিল বুকিং দিতে ফোন করতো তখন আজিজকে উত্তর দিতে হতো জয়বাংলা বলে। আমি বললাম বেশ তো। সে বলে, আমার আগে যারা সেই রেস্টুরেন্টে রিসিপশন ডেস্কে কাজ করছে সবাই পাকিস্তানি অথচ পুরো রেস্টুরেন্টের অন্য সবাই বাংলাদেশি। আমার ভেতর বেশ কৌতূহল জমা হয়েছে তবে আজিজকে আমি বুঝতে দেইনি। বললাম, তো সমস্যা কোথায়? সে বলে, না বাঙালিরা যুদ্ধের কথা ভুলতে পারেনি তাই আমাদের ভালো চোখে দেখে না।

সে আরো বললো, তার কাজিনও সেখানে কাজ করেছে এবং পরে বুঝতে পেরে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। আমি আজিজের কথা শুনেও কিছুটা না শোনার ভান করে পাশের কলিগের প্রতি মনোযোগী হয়েছি। কিন্তু আজিজ তার মতো করে বলেই চলছে। তখন আজিজকে বলেছিলাম, ‘এবার দেশে গিয়ে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে, যুদ্ধ করা আর নারী ধর্ষণ বা নির্যাতন করা এক কিনা? যদি যুক্তিসঙ্গত উত্তর না পাও তাহলে বুঝতে কষ্ট হবে না কেন বাংলাদেশিরা তোমাদের ঘৃণা করে।’

পাশের টেবিলে আরেক পাকিস্তানি গেস্ট রুটির সঙ্গে ভেড়ার গোশত অর্ডার দিয়েছে। একটু কৌতুহল ভাবে আমাকে বলে, বাঙালির মাছ ছাড়া চলে না বুঝি! আমি একটু বিরক্তির সুরে বললাম ‘তোমার বাবাও কি পাকিস্তান আর্মি থেকে বহিষ্কৃত এবং তুমিও কি জয়বাংলায় কাজ করেছ?’ বলে, না জোক করলাম। আমি এক গ্লাস পানি তার গায়ে ঢেলে দিয়ে বললাম, একটু তামাশা করলাম। ঘটনা দেখে সেদিন সবাই অবাক হয়েছিল! পাকিস্তানির রাগ হয়েছিল কিন্তু কিছু করতে পারেনি, কারণ আমার সঙ্গে সেদিন লোক বেশি ছিল তাদের তুলনায়। পরে জানতে পেরেছিলাম সে বাংলাদেশিদের প্রায়ই একটু টিটকারি দিয়ে কথা বলে। অনেক বছর আগের কথা, রক্ত তখন একটু বেশি গরম হয়তো বা বয়সের কারণে। তবে অন্যায় যদি কেউ করে বা দেশের উপর নেগেটিভ কিছু বলে তখন প্রতিশোধ নেবার প্রবণতা জাগে।

এখন যদি সেই প্রতিশোধ ঘৃণায় পরিণত হয় তখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করতেই পারে।

অনেক বছর পরে লন্ডনে গিয়ে জয়বাংলা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম ডিনারে। কথা প্রসঙ্গে তাদেরকে ঘটনাটি বলেছিলাম। তারা জানিয়েছিল পাকিস্তানিদের ক্ষোভের কারণ একটাই, প্রতিদিন বার বার মুখে জয়বাংলা শব্দ উচ্চারণ করা। জয়বাংলা রেস্টুরেন্টের মালিকের কথা শুনে মনে পড়ে গেলো তখন ‘মাগো ভাবনা কেন আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে; তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি, তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’।

আজ টিভিতে পোস্ট কোড মিলিয়নার টিভি প্রোগ্রাম দেখছি। নানা বিষয়ে প্রশ্ন এবং উত্তর সঠিক হলে এক মিলিয়ন সুইডিস ক্রোনার পুরস্কার এবং দি উইনার উইল টেকস ইট অল। ৩৫০ হাজার ক্রোনারের উপর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে বাংলাদেশের রাজধানীর নাম। কিন্তু মহিলা বলতে পারেনি যদিও সে সারাজীবন চাকরি করছে ওয়ার্লড অয়েলফার অর্গানাইজেশনে। আমার একটু রাগ হয়েছে এবং বেশ জোরে কিছু কমেন্টস করতেই আমার মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করে বসে, বাবা, তুমি বলো তো হাইতির রাজধানীর নাম কী? রাগ একটু বেড়ে গেল, স্ত্রী মারিয়া বলে রাগের কী আছে, না জানলে বলে দাও জানিনে। মেয়ে জেসিকা বললো, বাবা তোমার দেশ তোমার কাছে যতো সহজ ততোটা সহজ নয় সবার কাছে। হাইতির রাজধানী পোর্ট আও প্রিন্স (Port-au-Prince)।

জেসিকার কথাটি আমার ভাবনায় ঢুকেছে। আমরা যতো সহজে পরের নিন্দা করতে শিখেছি ততো সহজে পরের ভালো দিকটা দেখতে শিখিনি। ঘটনার মোড় ঘুরে গেল আর আমার ভাবনায় ঢুকে গেল হাজারও প্রশ্ন। নিউজিল্যান্ডের ট্রাজেডি আমাকে যেমন রাগান্বিত করেছিল একই সঙ্গে আংশিক ঘৃণার আবির্ভাব ঘটেছিল এ কথা ভেবে যে মসজিদে ঢুকে গুলি করে মুসলমানদের মারছে!

আমার ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের রুমমেট এবং সেই সঙ্গে হাউজ লিডার ডা. নাছিম আলি অনেক বছর বসবাস করছে সেখানে তার পরিবার নিয়ে। তাদের খবর জানতে তাকে ফোন করি। বন্ধু বললো, এত বছর ধরে বসবাস করছে কখনও ভাবনাতে আসেনি এমনটি হবে। সব মিলে নিউজিল্যান্ডের মানুষের সহানুভূতি, প্যাশন, হৃদ্যতা এবং টলারেন্স দেখে মনে হচ্ছে ধর্ম বা জাতির চেয়ে মনুষ্যত্বই মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়।

আমাকে সত্যি বেশি মুগ্ধ করেছে সে দেশের মানুষেরা। আমার যে ঘৃণাটুকু মনের অজান্তে জমেছিল তা এখন ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে নিউজিল্যান্ডের প্রতি। তবে পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে যে নির্মম অত্যাচার করেছিল একই ধর্মের মানুষের উপর সে ঘৃণা আজও কমেনি।

দেশে আমাদের যতোই সমস্যা থাক আমরা ঘরোয়াভাবে দেশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেই পারি। কিন্তু পরদেশি কিছু বললে বা আমাদের দেশকে ছোট করে দেখলে প্রতিবাদ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আজ ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস। আমি ভালোবাসি দেশের মানুষকে, আমি ভালোবাসি সোনার বাংলাকে।

যতো দূরেই থাকি না কেন, স্বাধীনতা তুমি চির উন্নত মম শির। সবাইকে স্বাধীনতার দিবসের প্রাণঢালা ভালোবাসা।

মন্তব্য
Loading...