যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগে কংগ্রেসম‍্যন সুয়ালওয়েলের পদত্যাগ

হাকিকুল ইসলাম খোকন, //

যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ইউএস কংগ্রেস থেকে এরিক সুয়ালওয়েল পদত্যাগ করেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি সুয়ালওয়েল। তিনি সোমবার  ঘোষণা দিয়েছেন, যৌন নিপীড়ন ও অসদাচরণের অভিযোগের মুখে  ইউএস কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার এই প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতার জন্য এটি এক নাটকীয় পতন যিনি রাজ্য গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। একই সঙ্গে, এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর প্রত্যাবর্তনের পর কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়া ‘#মি-টু‘ আন্দোলনের বিরল পুনরুত্থানের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদে সপ্তম মেয়াদে থাকা সুয়ালওয়েল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এগিয়ে ছিলেন। বর্তমান গভর্নর গ্যাভিন নিউসম-এর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে তিনি অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন, যা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল ও ধনী রাজ্যের নেতৃত্বে পৌঁছানোর সম্ভাবনায় এগিয়ে রাখছিল।
কিন্তু শুক্রবার পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়, যখন সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার সাবেক এক সহকারী অভিযোগ করেন, সুয়ালওয়েল তাকে দুইবার যৌন নিপীড়ন করেছেন। এরপরপরই সিএনএন-এ প্রচারিত প্রতিবেদনে আরও তিনজন নারী পৃথকভাবে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন।
সুয়ালওয়েল শুরুতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে এসব গুরুতর প্রতিবেদনের পর ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, ফলে রবিবার রাতে তিনি গভর্নর পদে নিজের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
এই বিতর্ক দ্রুত ক্যাপিটল হিলে ছড়িয়ে পড়ে। উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ সুয়ালওয়েলকে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগের আহ্বান জানাতে শুরু করেন। অন্যথায়, ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি আনা পলিনা লুনা তাকে বহিষ্কারের প্রস্তাব আনতে প্রস্তুত ছিলেন।
কংগ্রেস থেকে কাউকে বহিষ্কার করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন—যা একটি উচ্চ মানদণ্ড। তবে পরিস্থিতি যে সুয়ালওয়েলের জন্য দ্রুত কঠিন হয়ে উঠছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্যও প্রকাশ্যে তাকে বহিষ্কারের পক্ষে মত দেন।
এই তালিকায় ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান-এবং অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গায়েগো-যিনি সুয়ালওয়েলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেও পরিচিত। গালেগো সোমবার বলেন, “তিনি আর কংগ্রেসের সদস্য থাকার উপযুক্ত নন।”
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘আমি যাকে বন্ধু মনে করতাম, তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এখন স্পষ্ট, তিনি সেই মানুষ নন যাকে আমি চিনতাম। যারা সামনে এসে অভিযোগ করেছেন, তারা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের বিশ্বাস করা উচিত, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা উচিত।’
চাপ দ্রুত বাড়তে থাকায় এবং সম্ভাব্য বহিষ্কার ভোট সামনে আসায়, সোমবার সন্ধ্যায় সুয়ালওয়েল পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের ভিত্তি থাকতে পারে, তবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তবুও তিনি বলেন, পরিবার ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থে তিনি ব্যক্তিগত নাগরিক হিসেবে অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়বেন।
তিনি বলেন, “আমার অতীতের বিচারবোধের ভুলের জন্য আমি পরিবার, স্টাফ ও নির্বাচকদের কাছে গভীরভাবে দুঃখিত। আমার বিরুদ্ধে আনা গুরুতর মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে আমি লড়ব। তবে আমি যে ভুল করেছি, তার দায়িত্ব আমাকে নিতেই হবে।”
সুয়ালওয়েলের পদত্যাগের কিছুক্ষণ পরই টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি টনি গঞ্জালেস যিনি নিজেও যৌন অসদাচরণের অভিযোগের মুখে ছিলেন, কংগ্রেস ছাড়ার ঘোষণা দেন।
তিনি লেখেন, ‘প্রত্যেক কিছুরই একটি সময় আছে এবং ঈশ্বরের আমাদের জন্য একটি পরিকল্পনা রয়েছে। কংগ্রেস কাল পুনরায় অধিবেশন শুরু করলে আমি আমার অবসর গ্রহণের আবেদন জমা দেব। টেক্সাসের মানুষের সেবা করা আমার জন্য গৌরবের ছিল।’
আধুনিক সময়ে কংগ্রেস থেকে কাউকে বহিষ্কার করা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। সাধারণত নৈতিকতা কমিটি বা অপরাধ তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। সর্বশেষ ২০২৩ সালে নিউইয়র্কের সাবেক প্রতিনিধি জর্জ সান্তোস-কে বহিষ্কার করা হয়েছিল, যখন নৈতিকতা কমিটি তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সুয়ালওয়েলও এ বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, “অভিযোগ ওঠার কয়েক দিনের মধ্যেই যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করা ঠিক নয়। তবে একই সঙ্গে এটাও ঠিক নয় যে, আমার কারণে আমার নির্বাচকদের সেবা বাধাগ্রস্ত হোক।”
অন্যদিকে, লুনা বলেন, সুয়ালওয়েল পদত্যাগ করে ‘সঠিক কাজ’ করেছেন, তবে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের যথেষ্ট কারণ ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, ‘এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ফৌজদারি তদন্ত হওয়া উচিত, এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি জেলেও যেতে পারেন।’
এই ঘটনাপ্রবাহ ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্কগুলোকে নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল, সেখানে নিজেদের দলের সদস্যদের ঘিরে কেলেঙ্কারি সেই বার্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ক্যাপিটল হিলে সুয়ালওয়েল ছিলেন সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি ডেমোক্র্যাটদের স্টিয়ারিং অ্যান্ড পলিসি কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলার পর ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসন প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান ডেমোক্র্যাট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। ফ্লোরিডার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি শিলা চেরফিলাস-ম্যাককরমিক এবং রিপাবলিকান প্রতিনিধি কোরি মিলস-এর বিরুদ্ধেও পদত্যাগের দাবি বাড়ছে।
একটি হাউস এথিকস সাবকমিটি গত মাসে জানায়, শেরফিলাস-ম্যাককরমিকের বিরুদ্ধে আনা ২৭টির মধ্যে ২৫টি নৈতিক লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অবৈধভাবে প্রাপ্ত ফেডারেল দুর্যোগ তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। এ বিষয়ে ২১ এপ্রিল শুনানি নির্ধারিত হয়েছে।
এদিকে, ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি গ্রেগ স্টুব ইতোমধ্যেই তাকে বহিষ্কারের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, যা লুনা সমর্থন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মিলসের বিরুদ্ধে নির্বাচনী অর্থায়ন আইন লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, যৌন অসদাচরণ এবং কংগ্রেসের সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
সব মিলিয়ে, সুয়ালওয়েলকে ঘিরে এই কেলেঙ্কারি কেবল একজন রাজনীতিকের পতনই নয়, বরং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন এক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন