সংকটে শিক্ষা চালু রাখার পথ

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।  

করোনাকালে আমরা যারা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম তারা দেখেছি—বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত ও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক তেল সংকট থেকে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য আবারও অনলাইন ক্লাস পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও দেশের আর্থ-সামাজিক নাজুকতা ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় পূর্বের অবস্থান থেকে ভিন্ন বাস্তবতা এখনও গড়ে ওঠেনি। ক্ষেত্রবিশেষে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তারচেয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের বিকল্প পলিসি গ্রহণ করলে তা শিক্ষা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য ফলপ্রসূ হবে—সেটা বিবেচনায় আনা দরকার।

 

সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের ঘরে রেখে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় কমবে—এটা কি গবেষণালব্ধ ফলাফলে প্রমাণিত? শিক্ষকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসনের বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে। শিক্ষার্থীরা যদি শ্রেণিকক্ষে থাকে, তখন তাদের জন্য আনুপাতিক বিবেচনায় অল্প কিছু ফ্যান ও লাইট ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তারা যখন বাসায় থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে, তখন রুমে রুমে ফ্যান ঘুরবে, লাইট জ্বলবে, ক্লাসের বাইরে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার চলবে। তাহলে সাশ্রয় হবে কীভাবে?

 

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের দ্বারা সুফল পেতে পারে। নেটওয়ার্ক জটিলতা, ডিভাইসের অপ্রতুলতা এবং অভিভাবকদের অনীহায় অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে অনলাইন লেকচারে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া দীর্ঘক্ষণ মোবাইল মিডিয়ামে ক্লাস করলে স্মার্টফোন আসক্তি আবারও বৃদ্ধি পাবে। এতে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। অনলাইন ক্লাস নিয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সৎ ও মহৎ হলেও মাঠের বাস্তবতা এড়িয়ে মতামত দেওয়া যায় না। নানান সীমাবদ্ধতায় অনলাইন ক্লাস মুখ থুবড়ে পড়বে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আমাদের সামনে নির্মম বাস্তবতা। খাতভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংকোচন নীতির মাধ্যমে জ্বালানির বৃহৎ সঞ্চয় প্রয়োজন। শিক্ষাখাত থেকে জ্বালানির সংকোচন কীভাবে পরিচালিত হতে পারে, তা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হতে পারে। অনলাইন ক্লাসে না গিয়ে বিকল্প উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখার কিছু প্রস্তাবনা—

 

প্রথমতঃ স্কুলিং টাইম পরিবর্তন করে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত ক্লাস নিলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং শ্রেণি কার্যক্রমও স্বাভাবিক থাকবে।

 

দ্বিতীয়তঃ সপ্তাহে ছয় দিনের পরিবর্তে রোটেশন ভিত্তিক ক্লাস চালু করা যেতে পারে। একই শ্রেণিকে দুই ভাগে ভাগ করে একদিন পরপর ক্লাস নিলে ভিড় কমবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারও কমবে।

 

তৃতীয়তঃ একাধিক শিফটের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত সময়ের ঘন ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বিরতি কমালে প্রতিষ্ঠান চালুর সময় কমবে, বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমবে।

 

চতুর্থতঃ প্রশাসনিক কার্যক্রম আংশিক অনলাইনে রাখা যেতে পারে— মিটিং, নোটিশ, রুটিন সমন্বয় ইত্যাদি ডিজিটাল করলে অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব।

 

পঞ্চমতঃ সহশিক্ষা কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করা যেতে পারে। বড় সমাবেশ বা দীর্ঘ আয়োজন কমালে প্রতিষ্ঠান চালুর সময় কমবে।

 

ষষ্ঠতঃ পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাস করে অগ্রাধিকারভিত্তিক পাঠদান করা যেতে পারে। এতে কম সময়েও মূল বিষয়গুলো শেখানো সম্ভব হবে।

 

সপ্তমতঃ স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াত সাশ্রয়ের নীতি নেওয়া যেতে পারে— কাছাকাছি শিক্ষার্থীদের হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দিলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং স্বাস্থ্যগত উপকারও হবে।

 

সংকটের সময় সিদ্ধান্ত হতে হবে বাস্তবমুখী। অনলাইন ক্লাস নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় তা সর্বজনীন সমাধান নয়। বরং সময়সূচি পুনর্বিন্যাস, রোটেশন ক্লাস, প্রশাসনিক ডিজিটালায়ন ও পাঠ্যসূচি পুনর্গঠনের মতো নীতিগুলো গ্রহণ করলে শিক্ষাব্যবস্থা সচল রেখে জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি বড় বাস্তবতাগুলোকেও মাথায় রাখতে হবে—শপিংমলের আলোকচ্ছটা কমানোসহ অন্যান্য খাতে সংযম দেখালে জ্বালানির আরও বড় সাশ্রয় সম্ভব।

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন