ইতালির ম্যাগাজিন ‘লে এসপ্রেসো’ এমন একটি প্রচ্ছদ প্রকাশ করেছে, যা জায়নবাদী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। প্রচ্ছদটি প্রকাশ পায় ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল। ‘লি আবুসো’ (নির্যাতন) শিরোনামের ছবিটিতে দেখা যায়, একজন সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তার ফোনে দুর্দশাগ্রস্ত এক ফিলিস্তিনি নারীর ভিডিও ধারণ করছেন।
সেই সশস্ত্র ইসরায়েলির পরনে সামরিক পোশাক, মাথায় কিপ্পাহ এবং পাশে ঝুলে ছিল গোঁফ-চুল (পেয়ট)।
তিনি মোবাইল ফোনে ওই ফিলিস্তিনি নারীর ভিডিও ধারণ করার সময় নিষ্ঠুর আনন্দের হাসি হাসছিলেন। অন্যদিকে, জলপাই গাছের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন ওই নারী। তাকে বেশ ক্লান্ত ও কষ্টে ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখা যায়। ঘটনাটি মূলত জলপাই সংগ্রহের মৌসুমের সময় তার পূর্বপুরুষের জমিতে ঘটেছে।
এই ছবিটি তুলেছেন ইতালীয় ফটোসাংবাদিক পিয়েত্রো মাস্তুরজো। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর পশ্চিম তীরের হেবরনের কাছে ইধনা গ্রামে জলপাই সংগ্রহের সময় তোলা হয়। ছবিটি সাজানো নয়, কোনো কারসাজি করেও তৈরি নয় এবং অবশ্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা নয়।
বহু ইসরায়েলপন্থীরা এটিকে ভুয়া বলে দাবি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে।
তখনই ফটোসাংবাদিক মাস্তুরজো এবং লে এসপ্রেসো সম্পূর্ণ ভিডিও ফুটেজটি প্রকাশ করে দেয়।
সেখানে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল ইসরায়েলি সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী জলপাই সংগ্রহ করতে আসা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর ওপর আক্রমণ করছে। আরো দেখা যায়, ওই বসতি স্থাপনকারীদের একজন রাখালের মতো আওয়াজ করে একজন ফিলিস্তিনি নারীকে উপহাস করছে। এই ভূমিকে জায়নবাদী মতাদর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র ইহুদিদের জন্য ঈশ্বর নির্ধারিত বলে দাবি করা হয়, সেখানে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হচ্ছে।
এই ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইতালিতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত জোনাথন পেলেড।
তিনি এটিকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষী’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, প্রচ্ছদটি বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতাকে ভুলভাবে তুলে ধরেছে। তার মতে, সাংবাদিকতার উচিত নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া।
এরপর সামাজিক মাধ্যমে কিছু ইসরায়েলপন্থী নেটওয়ার্ক এই ছবির বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রচারণা চালায়, যেখানে অভিযোগ অস্বীকার ও সমালোচনা করা হয়। তবে বিতর্ক যত বাড়ে, ছবিটি তত বেশি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ অনেকের মতে, শক্তিশালী একটি ছবি কখনো কখনো প্রচারণাকে ছাড়িয়ে গিয়ে বাস্তবতার কঠিন ও সরাসরি চিত্র তুলে ধরে।
মাস্তুরজোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ছবি এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যা অনেকেই দেখতে বা স্বীকার করতে চান না। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রীদের প্রতি সমর্থন জানান, যারা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে এমন ঘটনা নথিবদ্ধ করেন।
তিনি ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘আমরা শুধু ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি অপরাধের কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি না, বরং সেইসব ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রীদের প্রতিও সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করতে চাইছি। যারা নিজেদের জনগণের ওপর হওয়া নির্যাতনের নিন্দা জানাতে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখেন।’
এই একটিমাত্র ছবি অনেকে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল বা গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার একটি প্রতীক হিসেবে দেখছে। এতে দেখানো হচ্ছে, কিভাবে ভূমি দখলের কাজ চলছে। কিছু সশস্ত্র বেসামরিক বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তাদের জমি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য জলপাই গাছ তাদের শিকড় ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রাচীন একটি প্রতীক। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব গাছ অনেক সময় উপড়ে ফেলা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। আগে যে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম ছিল শান্তি ও জীবিকার সময়, এখন তা অনেক এলাকায় ভয় ও সংঘাতের সময়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মেসাফার ইয়াত্তা এবং দক্ষিণ হেবরন পাহাড়ি অঞ্চলের মতো জায়গায়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূত ও তার সমর্থকেরা চান না, ইতালীয়রা এবং বিশ্ব দখলদারির এই দিকটি দেখুক। তারা বরং ‘আত্মরক্ষা’ ও ‘নিরাপত্তার’ পরিশোধিত চিত্রই তুলে ধরতে চান, যেখানে বাস্তুচ্যুতি ও দৈনন্দিন কষ্টের বাস্তবতা আড়ালে থাকে।
প্রচ্ছদের সঙ্গে প্রকাশিত লে এসপ্রেসোর প্রতিবেদনটি বিশদভাবে তুলে ধরেছে, কিভাবে জায়নবাদী ডানপন্থার সবচেয়ে চরমপন্থী অংশ সক্রিয়ভাবে ইসরায়েলি নীতিকে রূপ দিচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে পশ্চিম তীরে ভূমি দখল ত্বরান্বিত করা এক প্রকার ধীরগতির জাতিগত নির্মূল অভিযান। একে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে।
ছবিতে থাকা বসতি স্থাপনকারী কোনো একাকী উগ্রপন্থী নয়। সে একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রকল্পের পদাতিক সেনা। তিনি ইসরায়েলি আইনে সুরক্ষিত, আমেরিকান করদাতাদের অর্থে অর্থায়িত এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগুলো, এমনকি ইতালির মেলোনি প্রশাসন দ্বারাও কূটনৈতিকভাবে সুরক্ষিত।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি-এর সরকারের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। রাজপথের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং ‘গাজা প্রজন্ম’ নামে পরিচিত তরুণদের আন্দোলনের কারণে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এই আন্দোলন মূলত গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও প্রতিবাদের অংশ। এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ইতালির রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী প্রভাব এখন আর সম্পূর্ণভাবে একচ্ছত্র নয়। লে এসপ্রেসো-এর প্রচ্ছদে থাকা বসতি স্থাপনকারীর হাসির ছবি এখন এমন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা ইতালির রাজধানী রোমের পক্ষেও আর পুরোপুরি উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান সময়ে পশ্চিমা অনেক সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলোর বিরোধিতা করছে এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতিকে অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিযোগ্য হিসেবে দেখছে। এই প্রেক্ষাপটে লে এসপ্রেসো-এর এই প্রচ্ছদ প্রকাশকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আসল বিতর্ক ছবি নয়, বরং ছবিটি যে দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে সেটাই মূল বিষয়। যেখানে একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে। তা চলছে অস্ত্র, নজরদারি এবং ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে।
ছবিটি হয়তো একসময় শিরোনাম থেকে মুছে যাবে, কিন্তু জলপাই গাছগুলো থেকে যাবে এক অপরাধের অদম্য সাক্ষী হয়ে। যতদিন ফিলিস্তিনিরা বাধা ও সেনা উপস্থিতির মধ্যেও নিজেদের জমির ফসল সংগ্রহ করে যাবে, ততদিন এই বাস্তবতা সংবাদমাধ্যমে সামনে আসতেই থাকবে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের নির্যাতন চলতে থাকলে তা প্রকাশ করাও জরুরি।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, ছবিটি যে বানানো নয়, তা প্রমাণ করা কঠিন। আলায়ে আল-সাইদের লেখা ম্যাগাজিনটির প্রতিবেদন জর্দান উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যেখানে প্রায়ই ইসরায়েলি বাহিনীর মদতে বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় প্রতিদিন হামলা চালায়।
প্রতিবেদনে এমন আন্তর্জাতিক পদক্ষেপগুলোর দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেগুলো সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মাসে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ম্যাগাজিনটি এই ধরনের বিবৃতিকে অন্তঃসারশূন্য বলে অভিহিত করেছে। এখানে ইসরায়েলের কোনো জবাবদিহিতা নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দখল ও সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রধান সমর্থক বা নিশ্চয়তাকারী ভূমিকা পালন করছে, যা ধীরে ধীরে ও দীর্ঘ সময় ধরে চলছে।
একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘এই একটি ছবি হাজার হাজার সহিংস ঘটনার ছবির চেয়েও বেশি শক্তভাবে অবিচার ও দায়মুক্তির গল্প তুলে ধরেছে।’ তার মতে, ফটোগ্রাফি এখনও শক্তিশালী মাধ্যম।
এক্স-এ আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘যারা সাংবাদিকতার নীতিশাস্ত্র নিয়ে কথা বলে, তারা ইতিমধ্যে ২৬২ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে।’ অন্যদিকে আরেকজন ব্যবহারকারী ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘বাস্তবতা তুলে ধরাকে এখন ইহুদি-বিদ্বেষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন