সংকট নয়, সংকটের ভয়ই বড়

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।  

আমাদের সংকটটা আসলে অন্যরকম। জ্বালানির ঘাটতির চেয়েও সেটা অন্যত্র আরও বেশি ভয়ঙ্কর। এখনই সেটাকে নৈতিক সংকট বলছি না। 

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাতীত জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ তো বিশ্ব মানচিত্রের বাইরে নয়। তবে এখানকার সংকটটা একটু বেশি এবং বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন চরিত্রের। পেট্রোল-অকটেন আমাদের আছে। তবে ভবিষ্যতে অভাব সৃষ্টি হতে পারে সেটা ভেবে অতীতে যার তিন লিটার প্রয়োজন ছিল সে এখন যেকোনো উপায়ে তিরিশ লিটার কিনে মজুদ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সোনার বাংলায় এমন কম মানুষ মিলবে যাদের বাইক আছে অথচ দুই বোতল পেট্রোল কিনে ঘরে লুকিয়ে রাখেনি! উম্মুক্ত স্থানে পেট্রোল যে বোমার মতোই অনিরাপদ তা মাথাতেই নাই! গড্ডলিকা প্রবাহের প্রবণতা অনেকটাই আমাদের শিরাধমনীতে প্রবাহিত। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাক তবুও আমার স্বার্থ সবার আগে। 

 

খবরে দেখলাম, ভারতে কনডম উৎপাদনে চরম অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে রঙ্গ করে ভারতীয় মিডিয়া ব্যঙ্গ করে 'ইরান যুদ্ধের আঘাত ভারতের শয়নকক্ষে' শিরোনাম করেছে। কনডম উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল যা দরকার তা সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশ থেকে হরমুজ প্রনালী হয়ে জাহাজে ভাসতে ভাসতে ভারতে আসে। কাজেই অচিরেই ভারতে কনডম সংকট দেখা দিতে পারে। সংকট শুরু হওয়া মানেই মূল্য বৃদ্ধি। এই খবর দেখতে দেখতে স্বদেশীদের কথা মাথায় এলো। বাংলাদেশের বাজারের কনডম নিয়ে যদি এমন খবর মিডিয়ায় চাউর হতো তবে পঁচাশি বছরের বৃদ্ধও দুই ডজন কনডম কিনে হয়তো মজুদ করতো! সিরিয়াস আলাপে বাদ থাক এসব সিলি কথাবার্তা। 

 

পাম্প মালিকরা বলছে, সংকট আরম্ভ হওয়ার পূর্বে তাদের পাম্পে যেখানে প্রতিদিন সাত/আট হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হতো সেখানে এখন ১৫/১৬ হাজার লিটার দিয়েও কুলিয়ে উঠছেন না। পেট্রোলোর চাহিদা বেড়েছে তিন/চার গুণ। অথচ যোগান তো সেই আগের মতোই। এই বাড়তি চাহিদার কারন কী? প্রবল নৈতিকতার সংকট। শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-রমণী কে কাকে পিছিয়ে রাখছে! সবার মাঝে ভবিষ্যত নিয়ে সংশয়! যে যেভাবে পারছে মজুদ করছে। দেশের বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে, সরকারকে বিব্রত করতে সর্বোপরি জনগণের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে এবং অতিমুনাফার আশায় যা-কিছু করা দরকার তাই হচ্ছে জ্বালানির বাজারে। সরকার ব্যয় সংকোচন করতে আদেশ/নির্দেশ/অনুরোধ করছে অথচ চারদিকে পাল্লা দিয়ে খরচ বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সংকট ঘনীভূত করে তুলছে। 

 

বৈশ্বিক পরিস্থিতি যা তাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট অবশ্যম্ভাবী। তবে এই সংকট আরম্ভ হওয়ার শুরুকে প্রলম্বিত করতে পারে কেবল সচেতনতা। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট এবং বিশৃঙ্খলা হ্যান্ডেল করা সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অপতথ্য নির্ভর মিডিয়া- যারা গুজব রটায় এবং ছড়ায় তাতেই হুজুগবাদীরা বিবেকের দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করে। নয়তো মোটর বাইকের ট্যাংকি খুলে মাথায় তুলে পাম্পে হাজির হওয়া- এসব আপনি সুস্থতা হিসেবে দেখেন? বাংলাদেশের তেল/পানি- সবকিছুতেই ভ্রষ্ট রাজনীতির স্পর্শ, নষ্ট ব্যবসায়িক মানসিকতা ভর করেছে। ঘরে ঘরে তল্লাশি দিলে হাজার হাজার লিটার পেট্রোল-অকটেন পাওয়া যাবে! আমাদের মানসিকতার যে দৈন্যদশা তাতে কারো কারো গৃহে জেট ফুয়েলও মিলতে পারে! 

 

একবার গুজব রটেছিল বাজারে লবণের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের বোন/ভাবীরা তাদের জমানো পয়সাকড়ি নিয়ে বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তিরিশ টাকার লবন তিনশো টাকা দরে কিনে বাড়ি ফিরে বিজয়ীর গল্পে পাড়াপ্রতিবেশিকে জাগিয়ে তুললো। তাও দুই এক কেজি কিনে ক্ষান্ত হয়নি বরং হন্তদন্ত হয়ে অনেকেই ৪০ সেরের মনকে মন কিনেছে। পরে জানা গেলে লবণ ঘাটতির ব্যাপারটি একটি আধিভৌতিক ধরণের সুস্পষ্ট গুজব ছিল! ডিজেল/অকটেন/পেট্রোল ঘিরেও অনেকটা তাইতো তাইতো গল্প। কয়েকদিনের ব্যবধানে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেলে বিশৃঙ্খলা তো দেখা দিবেই। অথচ চাহিদা হঠাৎ উল্লম্ফনের আপাতত যৌক্তিক কোনো কারণ নাই। তবে কেন সংকট? সবই ঘটিবাটি তেল দিয়ে সয়লাব করে ফেলছে। জ্বালানি সংকট বিষয়ে মহাগুজব থামাতে না পারলে অচিরেই বাংলার ভাগ্যাকাশে মহাগজব নাজিল হবে। 

 

বলতে দ্বিধা নেই, দিনে দিনে আমাদের নৈতিক বল অনেকটা কাহিল হয়েছে। লোভ ছাড়া আমাদের থাকার মতো আর অনেককিছুই নাই। গর্ব করতে পারি এমন নৈতিক দৃষ্টান্তের এখানে চিরন্তন অভাব। সুযোগ পেলে একেকজন শয়তান চরিত্রের হয়ে উঠি। কিছু বাড়তি মুনাফার জন্য এ-তো বেশি মুনাফেকি করি- যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যারেল ব্যারেল তেল রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করতে হয়। এক্ষেত্রে কারো থেকে কেউ কম যায় না। বাস্তবে যার দুই লিটার প্রয়োজন সে যদি চার লিটার সংগ্রহ করে তবে একক হিসেবে এটাকে তেমন কিছু মনে হয় না কিন্তু এটা যখন লাখ একককে সংযুক্ত করে তখন দেশের হাল বেহালে না গিয়ে উপায় আছে? কাজেই ব্যক্তি পর্যায়ে সাশ্রয়ী হতে সচেতন থাকতে হবে। 

 

নৈতিকতা যার যার তার তার উপর নির্ভর করে। অবশ্য আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতাবোধেও সমস্যা আছে। এখনই শুধরে না গেলে ভবিষ্যতে প্রাচীনকালধর্মী জীবন-যাপনে ফিরতে হবে। আবার আমাদের আদিম পেশায় অভ্যস্ত হতে বাধ্য হওয়া লাগতে পারে। মোড়লরা যুদ্ধ-বিগ্রহের মনোভাব না থামালে বিশ্বের কপালে শনি আছে। তখন নগরের সাথে দেবালয়ও ভস্মীভূত হবে। ঘরের ফ্যান/লাইট, গ্যাসের চুলা- অপ্রয়োজনে যেন এক মিনিটও চালু না থাকে। একফোঁটা পানিও যেন কোনোভাবেই অপচয় না হয়। মানুষ হওয়ার দৌড়ে আমাদেরও যেন কার্যকরী অংশগ্রহণ থাকে। নৈতিকতার ভিত শক্ত না হলে সামনের সময়টা আমাদের জন্য সুখকর হবে না। কাজেই এখন থেকেই সাবধান। হীনমন্যতার খাসলত ছাড়তে হবে। খাবারের অভাব শুনলেই ক্ষুধা বাড়তে দেওয়া যাবে না।

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন