ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : প্রচণ্ড গরম ক্বেয়ামত দিবসের এক নীরব সতর্কবার্তা

শায়খ জামাল আবদি নাসির ||

গত কয়েকদিন ধরে আমরা প্রচণ্ড গরম অনুভব করছি । ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে—সব জায়গাতেই গরম আমাদের কষ্ট দিচ্ছে। অনেকের রাতে ঘুম হচ্ছে না, দিনের বেলায়ও অস্বস্তি লাগছে। আমরা অনেকেই এই গরম নিয়ে অভিযোগ করছি এবং চাইছি এটি দ্রুত চলে যাক। কিন্তু এই গরমের মধ্যেও আমাদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে—যদি আমরা তা গ্রহণ করতে চাই।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, জাহান্নামের আগুন একসময় আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে বলে, তার এক অংশ অপর অংশকে গ্রাস করে ফেলছে । তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দেন—একটি শীতকালে এবং অন্যটি গ্রীষ্মকালে। তিনি (সাঃ) বলেছেন, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম এবং শীতের তীব্র ঠান্ডা—উভয়ই সেই নিঃশ্বাসের প্রভাব। অর্থাৎ যে মাসগুলোতে জাহান্নাম গরম নিশ্বাস ছাড়ে ওই সময়টা হচ্ছে গ্রীষ্মকাল, আর যে মাসগুলোতে তীব্র ঠান্ডা থাকে ওই সময়টুকু হচ্ছে শীতকাল।

এ কথা শুনে একটু চিন্তা করুন। যে সূর্যের তাপ আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছে, সেটি আমাদের থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে । আমরা এমন দেশে বাস করি যেখানে ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার, ছায়া ও ঠান্ডা পানি সহজেই পাওয়া যায়। তারপরও আমরা গরম সহ্য করতে পারি না।

তাহলে ভাবুন, যদি এই সামান্য গরমই আমাদের জন্য এত কঠিন হয়, তবে কিয়ামতের সেই দিনের অবস্থা কেমন হবে, যখন সূর্য মানুষের মাথার খুব কাছে এনে দেওয়া হবে? সেদিন আল্লাহর দেওয়া ছায়া ছাড়া আর কোনো আশ্রয় থাকবে না।

এ কথা ভয় দেখানোর জন্য বলা হচ্ছে না। বরং আমাদের ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগিয়ে তোলার জন্য বলা হচ্ছে।
আল্লাহ দুনিয়ার এই সামান্য গরমকে আমাদের জন্য আখিরাতের একটি স্মরণিকা বানিয়েছেন । পৃথিবীর প্রতিটি আগুন, প্রতিটি শিখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এর চেয়ে ভয়াবহ একটি বাস্তবতা সামনে অপেক্ষা করছে।

একই সঙ্গে আমাদের উচিত পৃথিবীর সেইসব মুসলমানদের কথাও মনে রাখা, যারা শুধু গরম নয়; দুর্ভিক্ষ, খরা, ক্ষুধা ও পানির সংকটে দিন কাটাচ্ছেন । তাদের অনেকেই অভিযোগ করেন না। কারণ তারা জানেন, দুনিয়ার কষ্ট সাময়িক, কিন্তু আখেরাত চিরস্থায়ী। এমন ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা আমাদের মন নরম করে দেয়।

কিছু মানুষ বলেন, কেন বারবার জাহান্নাম বা কিয়ামতের কথা বলা হবে? এতে তো মানুষ ভয় পায়। কিন্তু আল্লাহ নিজেই কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বারবার আখিরাত, হিসাব ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন । যদি এসব জানা আমাদের জন্য ক্ষতিকর হতো, তাহলে তিনি কখনোই এগুলো জানাতেন না।স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—যাতে আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারি।

আসল সমস্যা আমাদের জ্ঞানের অভাব নয়। আমরা সবাই জানি কোন পথ সঠিক। আমরা জানি আখিরাতই স্থায়ী। আমরা জানি কোথায় পৌঁছাতে চাই। কিন্তু সেই জ্ঞানকে আমরা জীবনের কাজে পরিণত করতে পারি না। আল্লাহ বলেন- "কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জীবনকেই বেশি ভালোবাসো। অথচ আখিরাতই উত্তম এবং চিরস্থায়ী।"
(সূরা আল-আ'লা, ৮৭:১৬-১৭)

এ আয়াতে যেন আমাদেরই কথা বলছে। আমরা সামনের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিই, অথচ জানি, আসল জীবন তো আখিরাত। তাই আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমার সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক কেমন? আমি আখিরাতের জন্য কতটুকু আমল জমা করেছি? গরম আমাকে শুধু অভিযোগ করতে শেখায়, নাকি আল্লাহকে স্মরণ করতেও শেখায়? আমি কি সত্যিই আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি?

সাহাবায়ে কেরাম শুধু এসব কথা শুনতেন না, হৃদয়ে অনুভবও করতেন। একজন তরুণ সাহাবি ছিলেন, আখিরাতের কথা শুনলেই কেঁদে ফেলতেন । তাদের হৃদয় ছিল কোমল। আল্লাহর স্মরণ তাদের বদলে দিত।
আমাদেরকেও সেই হৃদয় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবে আমাদের দ্বীনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এটি শুধু ভয় নয়, আশাও শেখায়। আল্লাহ বলেন, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের তিনি জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে রাখবেন। তারা জাহান্নামের শব্দও শুনবেন না। তারা জান্নাতে চিরস্থায়ী শান্তিতে বসবাস করবেন।

এই জান্নাতের দরজা আমাদের সকলের জন্য খোলা । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের একটি সহজ আমল শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, জান্নাত নিজেই বলবে, "হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইবে, জাহান্নাম বলবে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। দেখুন, আমাদের রব কতই না দয়ালু! তিনি মুক্তির পথকে আমাদের জন্য কত সহজ করে দিয়েছেন।

তাই এই গরমকে শুধু কষ্ট হিসেবে নয়, মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করার একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করুন। এটি আমাদের আখিরাতের কথা মনে করিয়ে দিক। এটি আমাদের সেইসব মানুষের কথা মনে করিয়ে দিক, যারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য ধারণ করছেন। আর এই স্মরণ যেন আমাদের ভালো কাজের দিকে এগিয়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে সাহায্য করে।
হে আল্লাহ, আমাদের সবাইকে এমন একটি চিরস্থায়ী ঘর দান করুন, যেখানে থাকবে না কোনো গরম, কোনো ভয়, কোনো বিচ্ছেদ। আমীন।

শায়েখ জামাল আবদি নাসির : অতিথি খতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ । 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন