যুক্তরাজ্যে গ্রুমিং কেলেঙ্কারি : পাকিস্তানির অপরাধে অস্বস্তিতে দক্ষিণ এশীয়রা

কথায় বলে দশের লাঠি একের বোঝা। আবার একের অপরাধে দশের সাজা পাওয়ার ঘটনাও কম নয়।

যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানিদের কারো কারো ঘৃণ্য অপরাধ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসীদের অস্বস্তিতে ফেলেছে।

 

দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাজ্যে শিশু নিপীড়ন চক্রের (গ্রুমিং গ্যাং) অপরাধ এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। তবে গতবছর ব্যারনেস লুইস কেসির নেতৃত্বে পরিচালিত এক উচ্চপর্যায়ের তদন্তে গ্রুমিং গ্যাং-এর অন্ধকারে আলো ফেলা হয়।

গত বছর জুনে প্রকাশিত কেসি রিভিউ রিপোর্টে বলা হয়, প্রশাসনের তীব্র অন্ধত্ব, অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং অস্বীকৃতির কারণে দশকের পর দশক ধরে অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে।

 

 

ব্যারনেস কেসি তার রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলেছেন, এই অপরাধী চক্রগুলোর মূল হোতারা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত হওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ এবং স্থানীয় কাউন্সিলগুলো ব্যবস্থা নিতে ভয় পেয়েছিল। তারা ভেবেছিল কঠোর পদক্ষেপ নিলে তাদের ওপর ‘বর্ণবাদী’ তকমা দেওয়া হতে পারে।

কেসি তার রিপোর্টে সাফ বলেন, ’অপরাধীদের জাতিগত বা ভৌগোলিক পরিচয় নিয়ে তদন্ত করা কোনো বর্ণবাদ নয়।’ 

কেসি রিভিউ এবং সাথে সাস্প্রতিক দুটি ঘটনা পুরো বিষয়টিকে আবার আলোচনায় এনেছে।

আর অস্তস্তি বেড়েছে প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে।

 

রচডেলের গ্রুমিং চক্রের সাজাপ্রাপ্ত মূল হোতা শাবির আহমেদকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক টানাপড়েন চলছে অনেকদিন ধরেই। পাকিস্তান কিছুতেই শাবির আহমেদকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। এরমধ্যে গত সপ্তাহে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের বিধানসভায় রুখসার আহমেদ নামে এমন একজন ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন, যার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে শিশু যৌন নির্যাতন ও পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। সাবেক মন্ত্রী রুখসার আহমেদ ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নেন।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তদের ব্যাপারে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতামূলক মনোভাব সমস্যাকে আরো জটিল করেছে।

 

সমস্যা হলো এই ঘটনাগুলো কেবল যুক্তরাজ্য এবং পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো সামগ্রিকভাবে যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের প্রতিটি কেলেঙ্কারি সেই সব সম্প্রদায়ের প্রতি জনমনে সন্দেহ আরও গভীর করে, যারা এই অপরাধগুলোর সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না এবং এগুলোকে কখনো সমর্থনও করেনি।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি, ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয়রা প্রায়শই এই পরিস্থিতির শিকার হন। যখন ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র সম্প্রদায়গুলোকে সহজ এবং বিভ্রান্তিকর ‘দক্ষিণ এশীয়’ লেবেলের অধীনে এক করে ফেলা হয়। এমনকি যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমও পাকিস্তানীদের অপরাধকে ‘দক্ষিণ এশীয়’ বা ’এশিয়’ বলে শিরোণাম করে, যা সমাজে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং নিরপরাধীদেরও অস্বস্তিতে ফেলে। 

সমস্যাটি মোটেই জাতিগত বা ধর্মীয় নয়। পাকিস্তানী সমাজে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্বীকৃতির কারণেই নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা জেঁকে বসার সুযোগ পায়।

পাকিস্তানে এখনও উচ্চ হারে ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, অনার কিলিং এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সামাজিকভাবে একধরনের গ্রহণযোগ্যতা থাকায় এসব অপরাধে সাজা হয় খুবই কম। উল্টো ভুক্তভোগীদের তীব্র সামাজিক কলঙ্ক, হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে এ ধরনের অপরাধ না কমে বরং বাড়ে।

জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেসব বক্তব্য যৌন সহিংসতার জন্য নারীর পোশাক, আচরণ বা স্বাধীন চলাচলকে দায়ী করে; তা সমাজে বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এই ধরনের বক্তব্য অপরাধীদের দায়মুক্ত করে এবং ভুক্তভোগীদের ওপর অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দেয়।

’পারিবারিক সম্মান’এর বিষয়ে পাকিস্তানের সামাজিক ভাবনাটাই পুরুষতান্ত্রিক এবং বৈপরীত্যে ঠাসা। পুরুষতান্ত্রিক ধারণাগুলো নির্ধারণ করে দেয় যে, নারীরা শালীনতা ও আনুগত্যের মাধ্যমে পরিবারের সুনাম রক্ষা করবে। নইলে অনার কিলিংএর নামে তাদের হত্যা করা হবে। অন্যদিকে পুরুষদের অপকর্মকে প্রায়শই যৌক্তিক বলে মেনে নেওয়া হয় বা এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে সমাজের নীরবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা অনেক সময় অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়। আর পাকিস্তানীরা এই মানসিকতা বয়ে নিয়ে যায় যুক্তরাজ্য পর্যন্ত।

এই সমস্যা থেকে পাকিস্তানকে রক্ষায় কাঠামোগত সংস্কার যেমন দরকার, তেমনি দরকার অপরাধীর কঠোর সাজা নিশ্চিত করা এবং তাদের পাশে ঢাল হয়ে না দাড়ানো। দুঃখজনক হলো কাঠামোগত এই সমস্যাগুলোর যৌক্তিক সমালোচনাকে প্রায়শই পাকিস্তান-বিরোধী অপপ্রচার বা ইসলামোফোবিয়া হিসেবে খারিজ করে দেওয়া হয়। এই তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষামূলক মনোভাবই সংস্কারের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিটেনের নিজস্ব ইতিহাস এই ধরনের মানসিকতার মারাত্মক বিপদ প্রমাণ করে। সেখানে গ্রুমিং গ্যাং কেলেঙ্কারি দশকের পর দশক ধরে টিকে ছিল প্রমাণের অভাবে নয়; বরং বর্ণবাদের অভিযোগ বা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ভয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। যখন শিশুদের সুরক্ষার চেয়ে জাতীয় গৌরব বা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি বেশি অগ্রাধিকার পায়, তখন অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বা দায়মুক্তি পেয়ে জেঁকে বসে।

অপরাধের দায় সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত। ব্রিটিশ পাকিস্তানিদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও এই সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখে। তবে, এই সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে সততার সাথে আলোচনা করতে ব্যর্থ হওয়া সামগ্রিকভাবে প্রবাসীদের ওপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি এবং ভারতীয়রা; যাদের এই গ্রুমিং চক্রের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই; তারাও প্রায়শই নেতিবাচক জনধারণার শিকার হন। এর ফলে সাধারণ বর্ণবাদী আচরণ বা বিদ্বেষ বেড়ে যায়। তরুণ পেশাজীবী বা শিক্ষার্থীরা কেবল একই রকম দক্ষিণ এশীয় চেহারার কারণে সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিদের করা অপরাধের দায়বদ্ধতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হন, যা অত্যন্ত অন্যায়।

এই ধরনের ঢালাও মন্তব্য কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে সমানভাবে অসমর্থনযোগ্য হলো সেই সামাজিক পরিস্থিতিগুলোকে মোকাবিলা করতে অস্বীকৃতি জানানো, যা নারীবিদ্বেষকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। পাকিস্তান শিশু সুরক্ষা, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা এবং নারীর ওপর পদ্ধতিগত সহিংসতার মতো অভ্যন্তরীণ কঠিন আলোচনাগুলো এড়িয়ে গিয়ে প্রতিটি বহিরাগত সমালোচনাকে পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্য হিসেবে আখ্যায়িত করা চালিয়ে যেতে পারে না।

কোনো সমাজ রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা অর্জন করে না। বরং নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাগুলো উন্মোচন করে এবং সেই অনুযায়ী সংস্কার করার সাহসের মাধ্যমেই তা অর্জন করে। যতক্ষণ না পাকিস্তানের ভেতর থেকে সেই আত্মোপলব্ধি বা জবাবদিহিতা শুরু হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিটি নতুন কেলেঙ্কারি কেবল পাকিস্তানের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করবে। শুধু তাই নয় পাকিস্তানের এই সঙ্কট, যুক্তরাজ্যে থাকা লক্ষ লক্ষ নিরীহ দক্ষিণ এশীয়কেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকবে; যারা অল্প কিছু অপরাধীর কর্মের কারণে অন্যায়ভাবে বিচার বা সন্দেহের মুখোমুখি হচ্ছেন।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন