অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-
গতকাল ১৯ জুন, শুক্রবারের প্রথম আলো পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়তে প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক জনাব মহিউদ্দিন আহমদ 'ডেভলপমেন্ট ডিক্টেটরদের' প্রশংসা করেছেন । এদের মধ্যে দুই জনের নাম তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, তাঁরা হলেন- দক্ষিণ কোরিয়া পার্ক চু্্ হি এবং সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান । একই প্রবন্ধের এক পর্যায়ে লিখেছেন, "... এরপর আমরা অনেক ডিক্টেটরের দেখা পাই। আমাদের দেশে হাল আমলে ছিলেন শেখ হাসিনা... দেশটা চুষে, নিংড়ে, ছোবড়া বানিয়ে দিয়েছে... ।" যেমনটা আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় [ অধ্যায়- ১ (৮) ] বলেছেন, "অর্থনৈতিক ইঞ্জিন গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে ।" একই কথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসও বলেছিলেন । তিনি দেশের অবস্থাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত 'গাজার' সাথে তুলনা করেছিলেন । দেশকে 'অসভ্যতা' থেকে 'সভ্যতার' দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ।
প্রশ্ন হচ্ছে বিগত সরকারকে গালাগাল করতে গিয়ে দেশের গত দেড় দশকের অর্থনৈতিক অর্জনকে যদি অস্বীকার করা হয় সেটা হয়তো দেশের অভ্যন্তরীণে রাজনীতিতে উদ্ভট বয়ান তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এর দ্বারা কী বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে । গাজার ধ্বংসস্তূপ সারাতে বিদেশি সাহায্য পাওয়া গেলেও বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার সম্ভাবনা নেই । ২০০৬ সালে যেখানে আমাদের জিডিপি'র আয়তন ছিল ৭২ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪-এ সেটা দাঁড়িয়ে ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলার । মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় যাবতীয় অর্থনৈতিক সূচককে ২০০৭ সালের সাথে তুলনা করে দেখিয়েছেন, কিন্তু জিডিপির আয়তনের তুলনার কথা উল্লেখ করেননি । দেশকে 'ধ্বংসস্তূপ' বলা অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতির আয়তন দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন ডলার; আর মাথাপিছু আয় প্রায় তিন হাজার ডলার । বিগত দেড় দশকের বিবিএস এর প্রকাশিত উপাত্তকে অনেকে অতিরঞ্জিত বললেও প্রয়োজনে আবার সেই একই উপাত্তই কোন কাটছাঁট ছাড়াই ব্যবহার করছেন । এবারের বাজেটেও জিডিপির উক্ত উপাত্তকে অস্বীকার করা হয়নি । বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল আজকে ২০ জুন প্রকাশিত শনিবারের প্রথম আলোর উপ-সম্পদীয়তে লিখেছেন,"বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে ২০১০-২০২৪ সময়ে এই দেড় দশকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গড়ছিল প্রায় ৩ শতাংশ । বাংলাদেশ ও ভারতে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল সমান, অর্থাৎ ৬.২৪ শতাংশ । চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৫ শতাংশ, যা ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ। এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল- ভিয়েতনাম ৬.১২ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৪.৬ শতাংশ, সিংগাপুর ৪.৪% ,মিয়ানমার ৩.৬ শতাংশ ,পাকিস্তান ৩.৫ শতাংশ, শ্রীলংকা শতাংশ ।"
দেড় দশকে বার্ষিক গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী
(দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) দেশটিকে 'ধ্বংসস্তূপ' বা 'গাজা' বলা কতটা যৌক্তিক ? বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমাদের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন । এর জন্য আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর ৯.৫ শতাংশ অর্জন করতে হবে । আগামী বছরের বাজেটে এটা ৬.৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে । বিগত দুই বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে নিলে, যেটা প্রায় অনঅর্জনযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে । সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ছাড়া এটা কোনভাবেই সম্ভব নয় । আর দেশ সম্পর্কে বা দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে যত বেশি নেতিবাচক কথা বলা হবে এফডিআই তত দূরে সরে যাবে । দেশজ বিনিয়োগও গতি আসবে না ।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন