জামান সরকার, হেলসিংকি (ফিনল্যান্ড) থেকে ||
মানুষের জীবনে কিছু পথ থাকে, যা শুধু মাটি আর ধুলোর নয়, স্মৃতি আর ভালোবাসারও। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার গুয়াখোলা গ্রামের একটি ছোট্ট পথ আমার কাছে তেমনই এক পথ। সেই পথ ধরে একদিন স্কুলে গিয়েছি, স্বপ্ন দেখেছি, বড় হয়েছি। আজ পৃথিবীর উত্তর প্রান্তের দেশ ফিনল্যান্ডে বসবাস করি, কিন্তু জন্মভূমির সেই পথের কথা মনে পড়লেই হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ আমার প্রাণের দেশ। ১৯৮৯ সালে প্রবাস জীবনের যাত্রা শুরু করলেও জন্মভূমির প্রতি টান কখনো কমেনি। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বসবাস করলেও প্রতি এক বা দুই বছর পরপর দেশে যাই। আর দেশে গেলে অধিকাংশ সময় কাটে আমার জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার গুয়াখোলা গ্রামে।
আমার শৈশব, কৈশোর, স্বপ্ন ও স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় থেকেই আমি এসএসসি পাস করেছি। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও গ্রামের প্রতিটি পথ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মানুষ আজও আমার হৃদয়ের গভীরে স্থান করে আছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইমামগঞ্জ-বাসাইল-গুয়াখোলা-রামকৃষ্ণদী সড়কটি এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ২৩ বছর আগে প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের অধিকাংশ অংশ কার্পেটিং করলেও বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে প্রায় ৬০ মিটার অংশ আজও কাঁচা রয়ে গেছে।
দেশে ফিরলেই এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। সম্প্রতি জন্মভূমিতে গিয়ে আবারও সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটেছি। দেখেছি বৃষ্টির পানিতে কর্দমাক্ত পথ, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা রিকশা ও অটোরিকশা, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এবং বৃদ্ধ মানুষের অসহায়ত্ব। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি কাদার সাগরে পরিণত হয়। কোথাও পানি জমে থাকে, কোথাও পিচ্ছিল হয়ে পড়ে চলাচলের অযোগ্য।
এলাকাবাসীর ভাষায়, এটি শুধু একটি রাস্তার সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতিচ্ছবি। প্রায় প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যায়, রোগীরা ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ভোগান্তির শিকার হন।
একজন প্রবাসী হিসেবে আমি প্রতিদিন উন্নত বিশ্বের আধুনিক সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখি। কিন্তু নিজের গ্রামের মানুষের এমন দুর্ভোগ চোখে পড়লে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে, উন্নয়নের এই সময়ে একটি ব্যস্ত সড়কের মাত্র ৬০ মিটার অংশ কি ২৩ বছরেও পাকা করা সম্ভব হয়নি?
এই রাস্তা শুধু মাটির রাস্তা নয়। এটি হাজারো মানুষের চলাচলের পথ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের পথ, কৃষকের জীবিকার পথ, অসুস্থ মানুষের হাসপাতালে যাওয়ার পথ। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই পথই হয়ে উঠেছে দুর্ভোগ, ঝুঁকি ও অবহেলার প্রতীক।
গুয়াখোলার সন্তান হিসেবে, বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে এবং একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত আবেদন জানাই, দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান ঘটান। মাত্র ৬০ মিটার রাস্তা পাকা করে হাজারো মানুষের কষ্ট লাঘব করুন।
আমার বিশ্বাস, দায়িত্বশীল মহলের সদিচ্ছা থাকলে এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ। জন্মভূমির মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হোক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ।
হেলসিংকির বা ইউরোপের বিভিন্ন শহরের প্রশস্ত ও আধুনিক সড়কে চলতে চলতে যখন নিজের গ্রামের এই রাস্তার কথা মনে পড়ে, তখন বুকের ভেতর এক ধরনের কষ্ট জমে ওঠে। যে পথ দিয়ে ছোটবেলায় স্কুলে গিয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটেছি, জীবনের অসংখ্য স্মৃতি গড়েছি, সেই পথ আজও উন্নয়নের অপেক্ষায়।
প্রবাসে বসবাস করলেও আমার শিকড় গুয়াখোলার মাটিতেই প্রোথিত। তাই জন্মভূমির মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দেখে নীরব থাকতে পারলাম না। একজন গ্রামের সন্তান হিসেবে আমার প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এই ৬০ মিটার রাস্তা পাকা করবে এবং একটি গ্রামের মানুষের ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাবে।
সময়ের স্রোতে আমার জীবনের প্রায় চার দশক কেটে গেছে প্রবাসে। বদলে গেছে পৃথিবী, বদলে গেছে বাংলাদেশও। কিন্তু গুয়াখোলার সেই ৬০ মিটার পথ যেন সময়ের বাইরে আটকে আছে। আজও বৃষ্টির দিনে সেখানে জমে কাদা, আজও মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। আমি জানি, একটি রাস্তা কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। কিন্তু একটি গ্রামের মানুষের দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা নিশ্চয়ই গুরুত্বহীন হতে পারে না।
আমার জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই লেখা। অভিযোগ নয়, এটি একজন গ্রামের সন্তানের আবেদন। যেন আগামীবার দেশে ফিরে এসে দেখতে পাই, গুয়াখোলার সেই ৬০ মিটার আর অবহেলার প্রতীক নয়, বরং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের একটি ছোট কিন্তু উজ্জ্বল উদাহরণ।
একটি গ্রামের নয়, একটি জনপদের হাজারো মানুষের বুকভরা দীর্ঘশ্বাস যেন আর বছরের পর বছর বাতাসে ভেসে না বেড়ায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা এই অপেক্ষার অবসান হোক। কাদামাখা সেই ৬০ মিটার পথ একদিন উন্নয়নের আলোয় আলোকিত হোক, আর মানুষের চোখে ফুটে উঠুক স্বস্তির হাসি।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন