হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা এবং বর্তমান সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পরে মামলাটির আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী।
ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জসিতা ইসলামের আদালতে গতকাল এ মামলার আবেদন করেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ইকবাল। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে মামলাটির আবেদন খারিজ করে দেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম জানান, আদালত বলেছেন আসামিরা সরকারের অংশ ছিলেন। মামলায় বাদীর আনীত ধারা আসামিদের ওপর প্রযোজ্য নয় বিধায় তিনি মামলাটি খারিজ করে দেন। তিনি আরো জানান, আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন।
মামলার বাদী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
এটি কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে করা মামলা নয়। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের স্বার্থে বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরা আমার দায়িত্ব। যাদের অবহেলায় শিশুদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে আমি মনে করি।
মামলায় আরো যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা উচ্চশিক্ষিত ও নোবেল বিজয়ী হলেও তার দায়িত্বে চরম অবহেলা ও উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এ দেশের শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার শিশুর জীবন বিপন্ন হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, এ ঘটনা হত্যাকাণ্ডের শামিল। মামলার অন্যান্য আসামি তৎকালীন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্বে অবহেলা করে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামের ভ্যাকসিন যথাসময়ে আমদানি না করে শাস্তিযোগ্য ও অমানবিক অপরাধ করেছেন। এতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা এবং তাদের মৌলিক অধিকার হরণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাম-রুবেলা টিকা অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এই টিকা প্রদানের ফলে বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলায় মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকা আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম-রুবেলা টিকা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় টিকা সংকট তৈরি হয়।
আবেদনে দাবি করা হয়, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ২০ মে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জানান, হাম-রুবেলা টিকার সম্ভাব্য সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। এ ছাড়া টিকা আমদানির বিদ্যমান ব্যবস্থা বন্ধ না করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠকেও সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি বলে অভিযোগ করা হয়। এর ফলে দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
আবেদনে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫ হাজার ৭০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। সরকারি হিসাবে এ সময় প্রায় ৬১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে আরো বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো বহু শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এজন্য শিশুদের জীবন বিপন্ন হওয়ার ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আবেদন জানানো হয়।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন