পাঠ বনাম পাঠ-সংখ্যা

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক। |

বই পড়া বিষয়ে ভয়ংকর ভুলের সাথে চলা মধ্য তিরিশে ধরতে পেরে মনে হয় উপকারই হলো। এতোদিন পঠিত বই সংখ্যায় বাড়িয়ে গর্ববোধ হতো। অমুকের লেখা পড়েছি, তমুক বই নিয়েছি, সংগ্রহ করেছি বিস্তর কিংবা আমার পড়া বইয়ের সংখ্যা তিনশো তেতাল্লিশ- আদতে কোনোই বাহাদুরির কথা নয়। বছর দেড়েক আগে পাঠ করা একখানা বই আজ সকালেই নেড়েচেড়ে দেখলাম। বইখানা যে নিশ্চয়ই পড়েছি সেটার চিহ্ন বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রেখে দিয়েছি। কোথাও আন্ডার লাইন করা, কোথাও ছোট্ট নোট লেখা। অথচ আবার পৃষ্ঠা দুই পড়ে কোনোভাবেই মনে করতে পারলাম না যে- বইখানা ইতোপূর্বে আমি পড়েছি। এমনকি আন্ডারলাইন করা লাইন কিংবা নোট রাখা সাইনের কথাও আমার মনে পড়ছে না। 

 

পাঠক হিসেবে আমার মতো যারা গড়পড়তার মেধাবী, মনে রাখতে পারে কম তাদের আসলে পড়া বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে ফায়দা হবে না। বরং কায়দা করে পাঠাভ্যাস সাজাতে হবে। নির্দিষ্ট বিরতির পর পঠিত বইয়কে রিভিশন দিতে হবে। মনে করে দেখুন, যে বই বেশি ভালো লাগে সে বই দুই-তিনবার পড়ে ফেলেছি । সিনেমা নাটকের ক্ষেত্রেও তো তাই হয়? ধর্মীয় গ্রন্থের একই পৃষ্ঠা, একই লাইন কিংবা একটি শব্দ একজীবনে যে কত শতবার পাঠ করেছি তার ইয়ত্তা আছে? প্রত্যেকবার আলাদা আবেগ, ভিন্ন অর্থ এবং নতুন ব্যাখ্যা। গল্প-উপন্যাস একবার পড়লেও হতে পারে কিন্তু কবিতা-ইতিহাস বারবার না পরলে রস আস্বাদন করা যায় না। লেখকের উদ্দেশ্য এবং সত্যের অনেকটাই অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। যে পাঠ জীবন পাল্টানোর গল্প বলে তা হাজারবার পড়া যায়। পরীক্ষায় ভালো করতে যেমন একই বিষয়কে বারবার পড়ে-লিখে বোধগম্য করতে হয় তেমনি পাঠের মাধ্যমে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকা আলো অবলোকন করতে হলেও পুনঃপাঠের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। 

 

জীবন বদলে দেওয়ার মতো শক্তি এক-দু'খানা বইয়ের মধ্যেও থাকতে পারে। একজীবনে যদি হাজারখানা বইও পঠিত হয় তবে তা যেন দ্বিতীয়বার পাঠের সময় মেলে। প্রথমবারের চাষের মাধ্যমে জমিন যেমন পুরোপুরি সোনা ফলানোর জন্য প্রস্তুত হয় না তেমনি বইয়ের ক্ষেত্রেও একবারের পাঠে সঠিক উপলব্ধি অজ্ঞাতে থেকে যেতে পারে। দক্ষ কৃষক মানেই একই জমি বারবার কর্ষণ করে বীজ বপন উপযোগী চাষের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করে। যেকোনো বইও পড়তে হবে না বোঝার পূর্ব পর্যন্ত। ছোট্ট চটি বই শিক্ষার্থীদের দিয়ে পড়ানো হয় বছরজুড়ে- নিশ্চয়ই এখানে ইশারা আছে। খুঁজতে এবং বুঝতে সময়টা লম্বা নিলে সেটা পোক্তভাবেই মস্তিকে গাঁথে। পড়ার উদ্দেশ্য যদি রস হয় তবে তা একবারে মিলতে পারে কিন্তু যদি শিক্ষা হয় তবে শব্দের গাঁথুনি খতিয়ে দেখতে হবে। সরাসরি কথা বলতে হবে লেখকের সাথে। যদি সে লেখক হাজার বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে যায় তবুও তার পিছু নিতে হবে। 

 

আমরা খুব কম পড়ি কিংবা পড়ার জন্য প্রাত্যাহিক জীবন থেকে অল্প সময়ই বের করতে পারি। আমাদের গল্প করার অঢেল সময় মেলে। মোবাইলে ডুবে থাকার অপার অবকাশ-অবসর থাকে! গৃহের জন্য সব গহনা কিনি। অঙ্গের জন্যে সংগ্রহ করি নানা অলংকার। অথচ মস্তিষ্কের আভরন যে চিন্তায় গঠিত হয়ে সে চিন্তা সংগ্রহের জন্য কিতাব কিনি না। বইয়ের পেছনে অর্থের খরচ অপচয় মানতেও দ্বিধা করি না! কারো কারো ঘরে খানকয়েক বই থাকলেও সেগুলোর অঙ্গ জুড়ে ঢাকা ধূলোময়লার দুনিয়া। কোনো কোনো রুচিশীলের ঘরের দেয়ালে দেয়ালে অবশ্য আজকাল বইয়ের তাক থরে থরে থাকে। এসব দেখিয়ে আগন্তুকদের মনে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়/হয় আর-কি! পাঠের রূপরেখার আলোচনায় আজ এসব ভিন্ন আলাপ থাক না-হয়!

 

ব্যক্তিভেদে পড়ার ধরণ ভিন্ন রকম। রুচি-পছন্দও অন্যরকম। আমি কেবল আমার পড়ার পদ্ধতির ত্রুটিগুলো বলেছি। পঠিত বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি দিকে জোর দিয়ে আমি বোধহয় পাঠের উদ্দেশ্য থেকেই বিচ্যূত হয়েছি। তবে সঠিক-বেঠিকের চূড়ান্ত রায় এখনই দিচ্ছি না। ত্বড়িৎ বইয়ের পাতায় চোখ ফেলে উল্টিয়ে যাওয়ায় মাথা খালি রয়ে গেছে- এইটুকু বুঝতে পেরেছি বেশ ভালোভাবে। লাইনের মাঝে যে লাইন সেটাকে খুঁজে বের করতে হলে ধীরে চলতে হবে। পুরোনো প্রেমিকার মতো বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় চেনা পথে। মন টানে। নতুন গন্ধের মলাটবদ্ধ বই সাময়িক নেশা ধরাতে পারে বটে কিন্তু জীবনের পাঠে শেখায় কম। আগেও বলেছি, সব রকমের বইয়ের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব খাটবে না। ফিকশন একবার পড়লেও হয়, উপন্যাসের পৃষ্ঠায় ঘোড়সওয়ার হওয়া যায় কিন্তু কবিতার লাইন পুনরাবৃত্তি চায়। সেখানে বিচরণ করতে হয় সাবধানে, অতি সন্তর্পণে।  

 

গড় মেধাবীদের পাঠাভ্যাসের ধরণ পরিবর্তন করলে আশা করি ভালো ফল মিলবে। যে বইটা এই বৈশাখে শেষ হয়েছে সে বইটা আসছে বছরের শরতে আরেকবার হাতে নিলে পূর্বেকার চেয়ে পাঠের সময় কম লাগবে কিন্তু প্রাপ্তির পাঠ লম্বা হবে। সংখ্যা তো মান নির্ধারণ করতে পারে না। পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হতে হয় নিজের সাথে। জগতের কোনো কোনো মনীষীর জীবন বদলেছে মাত্র একখানা কিংবা কয়েকখানা বই পড়ে। কেউ কিংবা কোনো জাতি কি বই ছাড়া, কালো অক্ষরের আলো ছাড়া নিজেকে চিনতে, ভাগ্য বদলাতে পেরেছে?  মুশকিল হলো, সেই যুতসই বইখানা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য একটা দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। পড়তে হয়। ভাবতে হয় বিস্তর। পড়লে জীবনবোধ পাল্টায়। যে পড়া প্রশ্ন করা শেখায় সেই বোধই বোধহয় উত্তর খুঁজতে চিত্তকে তাড়িত করে। না পড়ে নিজে বদলে যাব এবং দুনিয়া বদলে দেবো- তা নাস্তি! পড়ুন, সঠিক পদ্ধতিতে পড়ুন এবং গড়ুন।

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন