জ্বালানি সিন্ডিকেট, জনভোগান্তি ও শিষ্টাচার নিয়ে সংসদে উত্তাপ

জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ খাতে ঋণের বোঝা আর সংসদীয় শিষ্টাচার নিয়ে বেশ সরব একটি দিন পার করল জাতীয় সংসদ। সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা সংকট সমাধানে নানা চেষ্টা ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। আর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এসব ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেন। সবমিলিয়ে বেশ উপভোগ্য আলোচনা হয় দিনভর।

রোববার (১৯ এপ্রিল) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী দেশের বর্তমান পরিস্থিতির নানা দিক তুলে ধরেন। 

 

আলোচনায় ছিল ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি ও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় সরকারের অবস্থান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সিন্ডিকেট দমনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট ও ‘ফুয়েল কার্ড’ প্রবর্তনের মতো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে বলে দাবি করেন। বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা তার এ দাবির কঠোর সমালোচনা করেন এবং রাস্তার দীর্ঘ লাইনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

সংসদের আলোচনায় উঠে আসে ৫২ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া বিল এবং প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের বোঝা বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে মজুত থাকা গ্যাস দিয়ে আগামী ১২ বছর সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। আর শিল্পমন্ত্রী জানান, গ্যাস সংকটে দেশের সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সরকার বিপুল পরিমাণ সার আমদানির জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে।

এলপিজি সিন্ডিকেট ও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট দমনে কঠোর বার্তা

 

ভোক্তা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি মজুতদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এলপিজি অপারেটরদের সংগঠনকেও ‘লোয়াব’ নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রির বিষয়টি সমন্বয় করতে বলা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিশেষ টিম নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, দেশে এলপিজির চাহিদার ৯৮.৬৭ শতাংশই আমদানি-নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য এনবিআরের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ থেকে আমদানির তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই দাবি করে মন্ত্রী বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া জনমনে ভীতি ও 'প্যানিক বায়িং' পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৫ লক্ষ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে এবং ১ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ঢাকা মহানগরীতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যা সফল হলে দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা হবে।

বিদ্যুৎ খাতের বিশাল বকেয়া ও আর্থিক শঙ্কা

সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া ১৭ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বকেয়া প্রায় ৩,৮৯১ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বকেয়া বিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিপরীতে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। এই বিশাল ঋণের বোঝা বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রী সংসদকে জানান, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত আছে (৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট), তা দিয়ে নতুন কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলেও আরও প্রায় ১২ বছর সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে ১০০টি কূপ খননের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

রুমিন ফারহানার তোপ ও সংসদীয় শিষ্টাচার বিতর্ক

জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি সরকারের 'সংকট নেই' দাবিকে মিথ্যাচার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সংকট যদি না থাকে, তবে পাম্পে ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন কেন? কেন রাত ৮টার পরিবর্তে ৭টায় দোকান বন্ধের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? তিনি দেশে অকটেন ও ডিজেলের প্রকৃত মজুত কতদিনের আছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করেন বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন, প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করা যায় না।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর

গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তার এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা আজ 'হায় হায়' করছে। তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।

এ সময় তিনি সংসদের সরঞ্জাম ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন। সালাউদ্দিন আইয়ুবী দাবি করেন, ১৮ লাখ টাকার ক্যামেরা ৫৮ লাখ টাকায় এবং ৪ হাজার টাকার পণ্য ২১ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। এমন দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি রোধে তিনি কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন। পাশাপাশি তিনি কাপাসিয়ার ধাধারচর এলাকাকে ‘দ্বিতীয় সেন্ট মার্টিন’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পর্যটনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সার কারখানায় গ্যাস সংকট ও আমদানির উদ্যোগ

শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সংসদকে জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের অধিকাংশ ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে কেবল ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার উৎপাদনে আছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মরক্কো থেকে প্রায় ৭ লক্ষ মেট্রিক টন সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। পহেলা মে থেকে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও ১০ম ওয়েজবোর্ড

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, খুব শীঘ্রই ১০ম ওয়েজবোর্ড গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। ৯ম ওয়েজবোর্ড নিয়ে চলমান আইনি জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ‘ভুয়া সাংবাদিকতা’ প্রতিরোধে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা করতে একটি অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। ২০২৬ সালের রমজানে দুই হাজার সাংবাদিক পরিবারকে ইফতার ও ঈদ উপহার প্রদান করার তথ্যও তিনি সংসদকে জানান।

হাসনাত আব্দুল্লাহর ক্ষোভ ও ‘মিম’ বিতর্ক

সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, তারকা চিহ্নিত প্রশ্নগুলো মৌখিকভাবে না নিয়ে শুধু টেবিলে উপস্থাপিত করার ফলে সংসদ সদস্যরা সম্পূরক প্রশ্ন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি এ ব্যবস্থাকে 'স্ক্রিপ্টেড মনোলগ সেশন' হিসেবে অভিহিত করেন।

এসময় কার্টুন বা মিম শেয়ার করার দায়ে হাসান নাসিম নামক এক ব্যক্তিকে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় গ্রেপ্তার করার সমালোচনা করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন এটি বাকস্বাধীনতার পরিপন্থি।

এর জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, তার নামে অপপ্রচারের কারণে দলগতভাবে জিডি করা হয়েছিল। তবে কেবল কার্টুন আঁকার কারণে কেউ গ্রেপ্তার হয়ে থাকলে তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত। এ ছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তি অন্য কোনো সাইবার অপরাধ বা মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন