অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কা চার বছর আগের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং নভেম্বরের প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা হওয়ায়, প্রেসিডেন্ট ডিসানায়েকে জ্বালানি সীমিত করেছেন, এর দাম এক-তৃতীয়াংশ বাড়িয়েছেন এবং বিদ্যুতের খরচ সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছেন।

আল আরাবিয়ার প্রতিবেদনে দেশটির এমন করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

 

 

শ্রীলঙ্কায় মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি কিনছে, যা ২০২২ সালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে—তখন অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল এবং মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে পৌঁছায়, কারণ দেশটি ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। সেই সময়ের বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসাকে, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল।

এদিকে রাজাপাকসাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ‘আরাগালায়া’ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টি (এফএসপি) সতর্ক করে বলেছে, ডিসানায়েকের সরকারও ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এফএসপির পলিটব্যুরো সদস্য দুমিন্দা নাগামুয়া এএফপিকে বলেন, “আমরা মনে করি, এই অর্থনৈতিক সংকটের জবাব রাজনৈতিকভাবেই আসবে।

 

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারের ম্যান্ডেটের শক্তির কারণে, এই অর্থনৈতিক ধাক্কা এখনও জনগণ সহ্য করছে, কিন্তু এটা এখনো রাজনৈতিক উত্তেজনায় পরিণত হয়নি।”

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের দুই মাস পর, ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ডিসানায়েকের দল জেভিপি বড় জয় পায় এবং দুই-তৃতীয়াংশ আসন দখল করে।

অর্থনীতি পতনের কিনারায় শ্রীলঙ্কা

কলম্বোর পেট্টাহ নাইট মার্কেটের ৫৫ বছর বয়সী বিক্রেতা ওয়াসান্থা জয়লাথ জানান, তিনি ২০২৪ সালে ডিসানায়েককে ভোট দিয়েছিলেন ভালো সময়ের আশায়, কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম দেশটি ভালো ও স্বনির্ভর যুগে প্রবেশ করবে।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দেশটি আরও গভীর সংকটে ডুবে যাচ্ছে।”

 

রাজধানীর প্রধান পাইকারি বাজারে ৫৩ বছর বয়সী ব্যবসায়ী প্রিয়ান্থা সুধারশানা সিলভা অবশ্য এই সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করছেন না। তিনি বলেন, “এখন বিক্ষোভ করে লাভ নেই, কারণ দেশ ইতোমধ্যে কঠিন অবস্থায় আছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও এগিয়ে যাওয়াটাই বড় সাফল্য।”

বেঁচে থাকার লড়াইয়ে থেমে গেছে প্রতিবাদ

মানবাধিকার আইনজীবী ভাবানী ফনসেকা বলেন, মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত থাকায় বিক্ষোভ কমে গেছে।

জ্বালানি রেশনিংয়ের ফলে লাইন ছোট হয়েছে, তবে বৃহস্পতিবার সরকার পানি সরবরাহের সময়ও সীমিত করেছে, যাতে সংরক্ষণ ও পাম্পিং খরচ কমানো যায়।

 

ভাবানী ফনসেকা বলেন, “২০২২ সালের তুলনায় এখন তেমন বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না। শ্রীলঙ্কা সদ্য আরেকটি ‘ঘূর্ণিঝড়’ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, আর সেটি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে সরকার।”

সতর্ক করে ফনসেকা আরও বলেন, জরুরি আইনের অধীনে গ্রেপ্তার ও আটক করার বিস্তৃত ক্ষমতা ব্যবহার করে জনবিক্ষোভ দমন করা হতে পারে, যা মানবাধিকার কর্মীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান আইন এবং এর প্রয়োগের ধরন দেখে আশঙ্কা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে মানুষের অধিকার আরও খর্ব হতে পারে।’

দ্বিমুখী আঘাতে বিপর্যস্ত দেশ

২০০৪ সালের এশীয় সুনামির পর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় দিত্বাহ গত বছরের শেষদিকে শ্রীলঙ্কায় ৬৪১ জনের মৃত্যু ঘটায় এবং প্রায় পুরো দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টিকারী এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।

সরকার গত ডিসেম্বর ৫০০ বিলিয়ন রুপি (১.৬ বিলিয়ন ডলার) অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও রেলপথ পুনর্নির্মাণে এবং জীবিকা হারানো মানুষদের সহায়তায় নগদ অর্থ প্রদানে ব্যবহার করা হবে।

কলম্বো দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ২০৬ মিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তাও পেয়েছে। বর্তমানে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল শ্রীলঙ্কায় রয়েছে, চার বছরের ২.৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি পর্যালোচনা করতে, যার পরবর্তী ৭০০ মিলিয়ন ডলারের কিস্তি ছাড়ের আগে এই পর্যালোচনা চলছে।

শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় তারা আইএমএফের ঋণের কঠোর শর্তাবলি সংশোধনের অনুরোধ জানাতে পারে।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন