জিবি নিউজ 24 ডেস্ক //
সিলেটের সদর উপজেলার জালালাবাদে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি ‘সাজানো মামলা’য় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মানিক মিয়ার সমর্থকদের বিরুদ্ধে মো. ওয়ায়দুল্লাহ ইছাহাকের দুই সমর্থককে মারধর, টাকা ছিনতাই ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হলেও রহস্যজনকভাবে অন্য আরেক প্রার্থী ইসলাম উদ্দিনের সমর্থকদের আসামি করা হয়েছে। এতে সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন (৯ নভেম্বর) রাত সাড়ে ১২ টায় জালালাবাদের ইসলামগঞ্জ বাজার থেকে জালালাবাদ ইউপির চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী মো. ওবায়দুল্লাহ ইছাহাকের মিটিং শেষে বাড়ি ফিরছিলেন তার সমর্থক কবির আহমদ এবং তার বাবা সুরুজ আলী। বাজারের অদূরে বাটুলের বাড়ির সামনে কবির ও সুরুজ আলীর ওপর হামলা করে মো. মানিক মিয়ার সমর্থকরা।
মামলার এজাহারে ২০ হাজার টাকা ছিনতাই ও মারধরসহ সিএনজিচালিত অটোরিকশা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, মানিক মিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় থাকা সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্রসহ হত্যার উদ্দেশে বাদী ও তার বাবার ওপর হামলা করে। হামলার সময় সুরুজ আলীর পাঞ্জাবি টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ হামলায় সুরুজ আলীর শরীরে গুরুতর জখম হয়। মামলায় ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ ১২০ থেকে ১৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্যতম আসামি আনিছ আলী বলেন, দুইবার হার্ট অ্যাটাকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিন রাত ১০ টার আগে বিছানায় ঘুমাতে যাই। প্রতিদিনের মতো ৯ নভেম্বর রাত ১০টার আগে ঘুমাই। পরদিন শুনি- ওই দিন রাত সাড়ে ১২ টায় কে, কারা আমার বাড়ির আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দূরে ইছাহাকের দুই সমর্থককে মারধর ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুরের অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় আমাকেও নাকি আসামি করা হয়েছে। মামলায় যে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মারামারি হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে সেই দুই প্রার্থীর সঙ্গে আমার নির্বাচন সংক্রান্ত সম্পর্ক বা পক্ষপাতিত্ব নেই। আমি অন্য প্রার্থীর প্রস্তাবক ছিলাম। তবুও রহস্যজনক কারণে আমাকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
নিজেকে ভুক্তভোগী উল্লেখ করে আনিছ আলী বলেন, প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বাদী মামলায় আমার নাম যুক্ত করেছে। বাদী একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ। তার বিরুদ্ধে চেঙ্গের খাল নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা রয়েছে, যেটি বেশ আলোচিত ঘটনা। দুই বছর আগে নদীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর সঙ্গে আমিও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম। সেই জেদের বশে বাদী আমার নাম মামলায় সংযুক্ত করেছে।
মামলার অপর আসামি ইলিয়াস মিয়া বলেন, জালালাবাদ ইউপি নির্বাচনে মো. ইসলাম উদ্দিনের সমর্থক আমি। কিন্তু আমাকে মানিক মিয়ার সমর্থক বানিয়ে মামলার আসামি করা হয়েছে। মামলা দেখলেই বুঝতে পারবেন কীভাবে সেটি সাজানো।
তিনি আরো বলেন, মামলার বাদী কবির আহমদ চেঙ্গের খাল নদীতে বলগেট ও নৌকা থেকে চাঁদাবাজি করতেন। চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতারও হয়েছিলেন কবির। মামলার আগে আমরা এলাকাবাসী নদীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সভা করে প্রতিবাদ করেছি। সেই প্রতিবাদে প্রথম সারিতে ছিলাম। তখন থেকেই বাদী আমাদের নানাভাবে হুমকি দিয়েছে। মামলায় যারা আসামি হয়েছেন তাদের বেশিভাগই কবিরসহ নদীতে চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। সুযোগ বুঝে টেলিফোন প্রতীকের সমর্থক সাজিয়ে আমাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। এতে আমরা সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি।
মামলার সাক্ষী মইনুল ইসলাম রাজা ওরফে রাজা মিয়া ঘটনা ও মামলা সম্পর্কে বলেন, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। আমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল না। মামলায় উল্লেখ করা ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলাম। আমাকে সাক্ষী হিসেবে রাখার ব্যাপারেও জানি না। মামলায় আমাকে সাক্ষী হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়নি। মামলায় কারা আসামি তাও জানি না। এ মামলার কোনো কাগজপত্রও আমি পাইনি। আমি শুধু শুনেছি-রাতে একটি ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, আমি লোকমুখে শুনেছি মামলায় আমাকে সাক্ষী করা হয়েছে। মামলার সাক্ষী হিসেবে আমার নাম গুজবও মনে করছি।
মামলার সাক্ষী জয়নুল মিয়া বলেন, জানা মতে আমি কোনো মামলার সাক্ষী না। আমি ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। যে সময় উল্লেখ করছেন আমি তখন বাড়িতে ছিলাম। তবে কে বা কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা জানি না।
মামলার অপর সাক্ষী দুদু মিয়া বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী। বাজারে আমার ফাস্টফুড ও ভুসি মালের দোকান আছে। আমি দোকানে ছিলাম। রাতে সাড়ে ১২ টার দিকে সুরুজ আলী আমার দোকানের সামনে আসেন। তবে কে বা কারা মারামারি করেছে জানি না। আমাকে কীভাবে সাক্ষী হিসেবে দেওয়া হয়েছে তাও জানি না। আমি কোনো হামলাকারীকেও দেখিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার এসআই সমীরণ সিংহ বলেন, ইসলামগঞ্জ বাজারের ঘটনার মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানি না হয় বিষয়টি সর্বোচ্চভাবে দেখা হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্ল্যাহ তাহের বলেন, নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে একটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। মামলাটি তদন্ত হয়ে অফিসার ইনচার্জ সুপারভাইজিং অফিসার হয়ে আসবে।
তিনি আরো বলেন, মামলা কিংবা ঘটনা নিবিড়ভাবে মনিটরিং হয় যাতে নিরপরাধ লোকেরা হয়রানির শিকার না হয়। একটি প্রেক্ষাপটে মামলা হয়েছে। মামলা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হবে। সাক্ষ্য, ডকুমেন্টারি, আলামতের ভিত্তিতেই তদন্ত হয়। তদন্তের মধ্যে ঘটনার একটি চিত্র চলে আসবে। তবে যারা নিরপরাধ বা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় তারা যাতে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য মামলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবহিত করা হবে।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন