হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর আজ

এক দশক আগে ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় জঙ্গিরা। ভয়াবহ এই হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে সাড়ে পাঁচ বছর আগে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন।

বর্তমানে মামলাটি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকাজে আর অগ্রগতি হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী হবে বলে জানিয়েছে। 

 

বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) নামঞ্জুর করে ২০২৩ সালে রায় দেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

কিন্তু চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এ মামলার বিচারকাজে আর অগ্রগতি হয়নি। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের লিভটু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে পালানোর সময় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন এক আসামি। 

 

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেন, যেকোনো মামলার দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলেও বিচারকস্বল্পতাসহ নানা বাস্তবতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তবে এই মামলাটি দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ উদ্যোগী হবে বললেও তিনি কোনো সময়সীমার কথা উল্লেখ করেননি। 

 

মামলার পূর্বাপর : হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই। নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল নামের পাঁচ তরুণ জঙ্গি রোজার ঈদের এক সপ্তাহ আগে পিস্তল, সাব-মেশিনগান আর ধারালো অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়েছিল হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয়।

তারা ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে। হামলা ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

পরে কমান্ডো অভিযানে জঙ্গিদের হত্যা করা হয়। হামলার পর পরই দায় স্বীকার করে ওই রাতেই বিবৃতি দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তত্কালীন সরকার আইএসের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি এই হামলার জন্য দায়ী।

 

ওই হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় রায় হয় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান নব্য জেএমবির এই সাত সদস্যকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেন। ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয় তাদের। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরো দুটি ধারায় তাদের কয়েকজনকে দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।

বিচারিক আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে, তা কার্যকরে  হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুসারে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলার যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়, যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট এ মামলার নথি আসে হাইকোর্টে। পরে দণ্ডিতরাও বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল ও জেল আপিল করে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল-জেল আপিলে শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ১১ অক্টোবর। পরে ওই বছর ৩০ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেন। গত বছর ১৭ জুন ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। 

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা গত বছর জুনে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক লিভ টু আপিল করেন বলে জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আরিফুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি এই মামলায় নেই জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের পর আসামিপক্ষের কেউ আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে শুনেছি, ছয় আসামির পক্ষে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়েছে।’ 

আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামিরা হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। 

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যায়। তখন কারারক্ষীদের গুলিতে মোট ছয়জন নিহত হন। নিহত এই ছয়জনের মধ্যে ছিলেন হলি আর্টিসান মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আসলাম হোসেন।

যে যুক্তিতে সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড : হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড থেকে সাত আসামির সাজা কমিয়ে কেন আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন, সে ব্যাখ্যা উঠে এসেছে ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে। হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, ‘ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও এই সাত আপিলকারী ষড়যন্ত্র ও ঘটনায় সহায়তা করেছেন, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ষড়যন্ত্র ও ঘটনায় (জঙ্গি হামলা) সহায়তার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬-এর ১ উপধারা (ক)(আ) দফায় বর্ণিত অপরাধে তারা দোষী। কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারার যথাযথভাবে উপলব্ধি না করে আপিলকারী আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, যা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। যে কারণে উক্ত রায়টি হস্তক্ষেপযোগ্য।’ 

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন