গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে এক করুণ মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে গর্ভধারিণী মায়ের মরাদেহ মর্গে, অন্যদিকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে বাবা এখন শ্রীঘরে। সাত বছরের নিশান মন্ডল আর পাঁচ বছরের সৃজন মন্ডল জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কী। রাস্তার ধারে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই শিশুর চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা আর বাবার ফেরার অপেক্ষা।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা পশ্চিমপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন স্বপ্না বাড়ৈ (২৬)। তিনি ওই গ্রামের দিনমজুর মিলন মন্ডলের স্ত্রী। এই ঘটনার পর স্বপ্নার বাবা পরেশ বাড়ৈ জামাতা মিলনের বিরুদ্ধে কাশিয়ানী থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ শনিবার মিলন মন্ডলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ৯ বছর আগে কোটালীপাড়ার কুমুরিয়া গ্রামের পরেশ বাড়ৈর মেয়ে স্বপ্নার সাথে মিলনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুটি সন্তান রয়েছে।
প্রতিবেশীরা জানান, বিয়ের দুই বছর পর থেকেই স্বপ্না মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। গ্রামবাসীর আর্থিক সহায়তায় তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসা করানো হয়েছিল।
প্রতিবেশী উন্নতি মণ্ডল বলেন:"স্বপ্না মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল এটা আমাদের সবার জানা। আমরা চাঁদা তুলে তাকে পাবনায় চিকিৎসা করিয়েছি। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও টাকার অভাবে নিয়মিত ওষুধ বন্ধ হওয়ায় সে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে।"
তবে নিহতের বাবা পরেশ বাড়ৈর অভিযোগ ভিন্ন। তিনি দাবি করেন:"আমার মেয়েকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হতো। জামাই মিলনের সাথে তার বৌদির অনৈতিক সম্পর্কের কথা জানতে পেরে স্বপ্না সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।"
পিতা-মাতার এই টানাপোড়েন আর আইনি লড়াইয়ের বলি হচ্ছে দুই অবুঝ শিশু। দিনমজুর মিলনের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হওয়ায় এখন এই দুই শিশুকে দেখভালের মতো কেউ নেই। স্থানীয়রা তাদের সান্ত্বনা দিলেও বাবার শূন্যতা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ শিশুদের চোখে-মুখে স্পষ্ট।
কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান জানান:"নিহতের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে মিলন মন্ডলকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। তদন্ত শেষেই প্রকৃত দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তদন্তের পর সত্য উদঘাটিত হবে ঠিকই, কিন্তু নিশান ও সৃজনের শৈশব থেকে যে বিষাদ আর একাকীত্ব শুরু হলো, তার দায় কে নেবে,।এ প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মনে।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন