বৈশাখ : বাঙালির সার্বজনীন উৎসব

সফিউল্লাহ আনসারী //

 

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনধারার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ঐতিহ্যের এক অনন্য উৎসব। ধর্ম, বর্ণ, পেশা, শ্রেণিভেদ ভুলে এই দিনে বাঙালি এক   অভিন্ন

পরিচয়ে মিলিত হয়। সে পরিচয় বাংলার মানুষ, বাংলাদেশী বাঙালি। বৈশাখ কেবল নতুন বছরের ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়; বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।

বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণের উৎসব বৈশাখ। বৈশাখ মানেই বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। বৈশাখের ছন্দ-উচ্ছ্বাস রবিঠাকুরের :এসো হে বৈশাখ এসো এসো... ' গানটিও যেনো মিশে গেছে বাঙালি আর বৈশাখী উৎসবে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে উৎসবকে অস্বীকার করা যায় না। সব জাতি-গোষ্ঠী ও মতাদর্শের লোকের কাছেই সমান গুরুত্বের দিন এ পহেলা বৈশাখ। হিজরি, খ্রিস্টাব্দসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব নববর্ষ উৎসব। 

ঐতিহাসিকভাবে মুঘল সম্রাট আকবরের সময় কৃষি ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। সেই থেকে বৈশাখ মাস বাঙালির জীবনে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এই দিনটি কেবল প্রশাসনিক প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন এটি গ্রাম থেকে শহর, দেশ থেকে প্রবাস সবখানেই বাঙালির আনন্দ-উৎসবের দিন। হালখাতা এই বৈশাখের ঐতিহ্য যা আবহমান বাংলায় বাংলা নববর্ষে এখনো চলছে। 

পহেলা বৈশাখের সকাল শুরু হয় নতুন আশায়, নতুন প্রত্যয়ে। লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবি, মুখে হাসি, হাতে ফুল সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত আবহ তৈরি হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, লোকগান ও নৃত্য এসবই এই দিনের প্রধান আকর্ষণ। তবে এর বাইরেও রয়েছে এক গভীর তাৎপর্য: পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন করে পথচলা শুরু করার মানসিকতা।

বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সার্বজনীনতা। এখানে কোনো ধর্মীয় বিভাজন নেই, নেই কোনো সংকীর্ণতা। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই একসঙ্গে এই উৎসব উদযাপন করে। এই দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল, যেখানে একটি জাতি তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মাধ্যমে ঐক্যের বার্তা দেয়। বর্তমান বিশ্বে যখন সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজন ক্রমেই মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন বৈশাখ আমাদের শেখায় সহাবস্থান, সহনশীলতা ও মানবিকতার পাঠ।

তবে আধুনিকতার প্রভাবে বৈশাখ উদযাপনে কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাণিজ্যিকীকরণ, ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা ও কৃত্রিমতার ছাপ অনেক সময় এই উৎসবের মৌলিক সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। তাই প্রয়োজন এর শেকড়ে ফিরে যাওয়া লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আন্তরিকতার চর্চা বাড়ানো।

বৈশাখ আনন্দ উৎসবের পাশাপাশি আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার হিসেবে এই দিনে আমরা নিজেদের বাঙালি হিসেবে নতুন করে চিনতে শিখি, ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করি। নতুন বছরের প্রথম দিনে যদি আমরা সাম্য, মানবতা ও সম্প্রীতির অঙ্গীকার করতে পারি, তবে বৈশাখ সত্যিকার অর্থেই তার সার্থকতা পাবে। 

বৈশাখ আসে নতুনের আগমনে, পুরোনো বিদায় করে বাংলা এবং বাঙালির জীবন ও সময়কে রঙিন মঙ্গলময় করে দিতে। যতো পাপ-তাপ-গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে বৈশাখ। বাঙালি সারা বছরের জীর্ণতা শেষে নতুন দিনের প্রত্যাশায় বরণ করে নেয় বছরের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষকে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রেরণা। এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়কে শানিত করে, করে উজ্জীবিত। শত ব্যস্ততায়ও, মহাকালের চিরায়ত নিয়মে বৈশাখ বরণে, নববর্ষের উদ্দীপনায় মেতে উঠে বাংলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈশাখ যে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব তার প্রমাণ এই বৈশাখের প্রথমদিন এবং বৈশাখ বরণে সবার অংশগ্রহণ। বলতে দ্বিধা নেই, পহেলা বৈশাখই হতে পারে বাঙালির জাতীয় উৎসবের দিন, কারণ সব বাঙালির জন্য এ উৎসব একই অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত।

বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা 'এসো হে বৈশাখ' গানের মাধ্যমে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে। বৈশাখ আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, আমাদের এক করে, আমাদের চিনতে শেখায়। এই সার্বজনীন উৎসবের চেতনা বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকুক এই প্রত্যাশায়ই হোক আজকের দিনের মূল কথা।বৈশাখী হাওয়ায় নতুন স্বপ্নের পথচলা বৈশাখের সার্বজনীন সামাজিক উৎসবের ঐতিহ্য। "বৈশাখ এলে পুলক মনে /জাগে নতুন আশা, নতুন বছর আনন্দ ঢেউ / অঝর ভালোবাসা। একটি বছর যায় হারিয়ে / আসে নতুন বর্ষ, বৈশাখ মানেই বাঙালিয়া/ মনে খুশির হর্ষ।" বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে। 

#

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন