রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাংলা/ইংরেজিতে রিডিং শেখাতে পারেননি সেটা শিক্ষকের সমস্ত শিক্ষক জীবনের ব্যর্থতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাধ্যমিক স্তরের খুব কম সংখ্যক হেডমাস্টার ক্লাস নেন বা নেওয়ার সুযোগ থাকে। অন্য অনেক কাজের সাথে ক্লাস মনিটরিং করাই হেডমাস্টারদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী দেখে বাংলা পড়তে পারে না এটাতে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষকদের একক দায় যতটা তারচেয়েও বড় অংশের দায় প্রাথমিক শিক্ষার। অথচ কোন ক্লাসে শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে কতটা শিখনফল অর্জন করবে তা কারিকুলামে নির্ধারিত।
সরকারি মাধ্যমিকে ক্লাস টু/থ্রি থেকে লটারিতে যে শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ থাকে তাদের অনেকেই বর্ণমালা চেনে না। কেবল সরকারি মাধ্যমিকে চান্স পাওয়াতে জন্ম নিবন্ধনের বয়স বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বিষম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয়। তারপরেও যে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি ক্লাস ডিঙিয়ে ষষ্ট শ্রেণীতে অবতীর্ণ হয়েছে তারা দেখে বাংলা পড়তে পারবে না- এটা শিক্ষকতা পেশার সমষ্টিগত লজ্জা। কোথাও না কোথাও ভীষণ ঘাটতি রয়ে গেছে। শিক্ষক হিসেবে এটা সারিয়ে তোলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের দায়িত্ব। যাদের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব তারাও কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না।
তবে শিক্ষকদের ভুল/ব্যর্থতার বিচার যদি শিক্ষার্থীদের সামনেই হয়, থ্রেট/শাস্তি কিংবা কৈফিয়ত তলব যদি শিক্ষার্থীদের সাক্ষাতেই গ্রহণ করা হয় তবে শিক্ষার্থীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। শিক্ষক ব্যর্থ হলে তাকে শাস্তি দেওয়ার বহু বৈধ ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষের আছে। লাইব্রেরিতে শিক্ষকদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া, হেডমাস্টারকে শোকজ দেওয়া, বেতন বন্ধ রাখার জন্য উর্ধ্বতনদের কাছে লেখা কিংবা চাকুরিচ্যুত করা- সীমায় থেকে শিক্ষার মঙ্গলের জন্য যা-কিছু ন্যায্য তা করা যায়। তবে শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষকদের হেনস্তা করার সন্তানদের সামনে বাবাকে অপমানিত করার নামান্তর! এর পরিণতি কী হতে পারে, প্রজন্ম কেমন বার্তা পেয়ে বেড়ে উঠতে পারে- তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিরাপত্তাজনিত এখনো এমন কোনো থ্রেটের কথা সামনে আসেনি যাতে অস্ত্রসহযোগে নিরাপত্তাকর্মীসহ ক্লাসরুস ভিজিট করা লাগতে পারে। শিক্ষার্থীদের চোখে ও মনে গোলাপ নিরাপদ হলেও বুলেট নিরাপদ নয়। কোমল মনে অস্ত্রভীতি ফোবিয়ার পর্যায়ে যেতে পারে।
তাছাড়া অস্ত্রধারী পাহারাদারসহ কোনো কর্মকর্তাকে দেখলে শিক্ষার্থীদের পড়া ভুলে যাওয়া, ভয় পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। এতে শিশুর স্বাভাবিকতার বিপর্যয় হতে পারে। আমাদের ছোটবেলায় কড়া মাস্টারদের হাতে খেজুরের লাঠি দেখলেই পড়া ভুলে যেতাম! এই প্রজন্মের শিশুদের অস্ত্রের ভয় কাটিয়ে ওঠা এখনো সম্ভব হয়নি বোধহয়! গানম্যানসহ ডিসি/ইউএনওকে দেখলে শিক্ষার্থী তো দূরের কথা অনেক শিক্ষকদেরও মানসিক চাপ ও অস্বস্তি বাড়ে! ভয়ের সংস্কৃতি থেকে এখনো জাতির উত্তরণ ঘটেনি। শাসকদের বন্ধু হতে হলে কতগুলো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। কেবল শাসন ছাড়াও ভালোবেসে কাজ আদায় করে অনেকেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সবকিছু কেনো ফেসবুকে দিতে হয়? কান ধরানো, ধমকানো এসব প্রচার করে প্রশংসা যতটা মেলে তারচেয়ে গালাগাল ও ঘৃণা মিলতে পারে বেশি- শঙ্কা কী উড়িয়ে দেওয়া যায়? আলোচনায় বসে যে সমস্যার সমাধান করা যায় সে সমস্যার সমাধান কী ফেসবুকে প্রচার করলে হবে? একটা কিছু হলেই আমরা সবকিছুই ফেসবুকের কাছে তুলে দেওয়ার মতো প্রবণতা দেখাই। এর সবকিছুর প্রভাব ভালো হয় না।
বহু গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে, রিডিংয়ের দুর্বলতা, যোগ-বিয়োগ করতে না পারা- এসব এখন জাতীয় সমস্যা। উত্তরণের উপায় না খুঁজে আমরা নিজেদের প্রচারে যখন ব্যস্ত হয়ে উঠি তখন নিজের পেশাকেই খাটো করি। এমন আরও অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা স্কুল ভিজিটে যান, সমস্যা পান এবং নিভৃতে সমাধানের বন্দোবস্ত করে আসেন। আবার কেউ কেউ কারো খুঁত পেলে তা নিয়ে বাজার বসাতে উদ্যত হয়ে ওঠেন। এতে নিজেরও যে ক্ষতি করেন তা বুঝতে কিছুদিন লাগে হয়তো কিন্তু একবারে মুক্তি মেলে না! দায়িত্বানদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন