কোনো রকম সরকারি সহযোগিতা নেই। নেই কোনো রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিও। উচ্চশিক্ষা নেই, নেই সম্পদ। গ্রামগঞ্জের এ ধরনের নিরীহ মানুষগুলোই পরিবারের মায়া-মমতা, ভালোবাসা থেকে বহু দূরে ভিনদেশে ছুটে গিয়ে ওপরে টেনে তুলছে দেশকে। প্রবাসী এসব শ্রমিক যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছে, তা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেক। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই মেটানো হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি আমদানি ব্যয়, সরকারের বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের কিস্তি। প্রায় ৯০ লাখ প্রবাসী কর্মী বিশ্বের ১৫৫টি দেশের মাটিতে শরীরের ঘাম ফেলে নিজ দেশে পাঠাচ্ছে নগদ অর্থ। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের মোট জিডিপির ১১ শতাংশ। এ ছাড়া সরকার বিদেশ থেকে যে পরিমাণ সাহায্য পায়, তার চেয়ে সাতগুণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৩ গুণ বেশি অর্থ পাঠায় প্রবাসী শ্রমিকরা। ধার ও সুদে ঋণ নিয়ে, জমি বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে কাজের সন্ধানে দেশান্তরী হওয়া শ্রমিকদের পাঠানো এই অর্থেই সমৃদ্ধ হচ্ছে পুরো দেশ।
আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছে ১৯৭৬ সালে। ওই বছর বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো ১৪ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কাজের খোঁজে যায় মধ্যপ্রাচ্যে। ওই বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল পাঁচ কোটি ডলার। তার পর থেকে প্রবাসীর সংখ্যা আর তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দিক থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের পরেই অবস্থান প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে পোশাক রপ্তানির জন্য বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় মেটাতে হয় বাংলাদেশকে। প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তেমনটি নেই। প্রবাসীদের ব্যক্তি উদ্যোগেই এ খাত সম্প্রসারিত হয়েছে। অবশ্য অতি সম্প্রতি সরকার বন্ধ হওয়ার চার বছর পর মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্তকরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখে। তবে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত কিছু বাজারও বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে কাজ করছে। এর মধ্যে ৯০ ভাগই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গেছে পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৩৮৯ জন। ২০১১ সালে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছে এক হাজার ২১৭ কোটি ডলার। ২০১২ সালে এ খাতের আয় ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে সরকার। গত নভেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ২৮৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
বাংলাদেশ যে পরিমাণ রপ্তানি করে, তার প্রায় দেড়গুণ খরচ করতে হয় আমদানির পেছনে। মাঝখানের এই ফারাকের জন্য বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য এবং রেমিট্যান্সের ওপরই নির্ভর করতে হয় সরকারকে। দিন দিন বৈদেশিক সাহায্য কমতে থাকায় রেমিট্যান্সের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতাও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবাসী-আয় বাংলাদেশে যে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বাড়াচ্ছে তাই-ই নয়, দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে করেছে সুদৃঢ়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ গেছে অর্থ ধার করে, আর ৪১ শতাংশ গেছে জমি বিক্রি বা বন্ধক রেখে অর্থ সংগ্রহ করে। এসব শ্রমিকের বড় অংশই অদক্ষ বা আধা দক্ষ। ফলে বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাদের। প্রবাসীরা আয়ের বড় অংশই দেশে পাঠায়। সেই অর্থেই অনেকের পরিবার চলে। তবে পরিবারের চেয়েও বেশি লাভবান হয় সরকার। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পায়।
রেমিট্যান্স আয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ভারত, চীন, ফিলিপাইন, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও মিসরের পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক বেগম শামছুন নাহার বলেন, অভিবাসী কর্মীদের অবদান দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করছে, তেমনি প্রবাসীরা তাদের পারিবারিক জীবনমানও উন্নত করতে পারছে। বাড়ছে তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতাও।আবুল কাশেম।




