চৌধুরী আলমের হাত ধরেই ক্যাসিনো আরমানের উত্থান

75
gb

বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪ 

পুরান ঢাকার আনন্দবাজার, বঙ্গবাজার ও তৎকালীন ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালসহ একাধিক মার্কেটের চাঁদা আদায় করতেন রমনা থানা বিএনপির সভাপতি চৌধুরী আলম। এছাড়া রেলওয়ে কলোনির মাদকও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ওই সময় এনামুল হক আরমান ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে ঢাকায় এসে বায়তুল মোকাররম মার্কেটের সামনে ফুটপাতে পুরাতন লাগেজ বিক্রি শুরু করেন। ফুটপাতের দোকানের চাঁদা দিতে গিয়ে চৌধুরী আলমের সঙ্গে আরমানের পরিচয় হয়।

তখন থেকেই আরমান চৌধুরী আলমের সঙ্গে থেকে হকারদের বিএনপির মিছিল মিটিংয়ে লোকজন আয়োজন করতেন। মিটিং মিছিলে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিকটাত্মীয় বাউন্ডারি ইকবাল হিসেবে পরিচিত ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। ইকবালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বিএনপি শাসনামলে হাওয়া ভবনে যাতায়াত শুরু করেন আরমান। সেই সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির ছত্রছায়ায় মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি। সেই প্রভাব খাটিয়ে বিএনপি আমলেই ফকিরাপুলের কয়েকটি ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণ নেন আরমান। এরপরই আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে যুবলীগে ভিড় জমান তিনি। এক পর্যায়ে যুবলীগের এক শীর্ষনেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা শুরু করেন। সুদর্শন ও বুদ্ধিমান আরমান খুব অল্পদিনেই ওই যুবনেতার আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। এভাবেই মহানগর যুবলীগের সবাই তাকে শীর্ষ যুবনেতার বন্ধু হিসেবে চিনতে শুরু করেন। এরপর ওই যুবনেতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনো বাণিজ্যের চল শুরু করে আরমান। তারপর থেকে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কলাবাগান ক্লাব, ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব, ওয়ান্ডার্স ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব, অ্যাজাক্স ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন আরমান। চাঁদা তোলার পাশাপাশি ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের মালিকানায় ঢুকে পড়েন তিনি। ক্যাসিনো কারবারের টাকা তুলেই গুলিস্তানের হকার থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান আরমান।

ক্লাবপাড়ার লোকেরা জানায়, আরমান নতুন মডেলের হ্যারিয়ার গাড়ি দাপিয়ে চাঁদা তুলতেন। দুটি ক্যাসিনোতে মালিকানাও রয়েছে তার। কোনো ক্যাসিনোর চাঁদার পরিমাণ কত হবে তা শীর্ষ যুবনেতার সঙ্গে বসে ঠিক করে দিতেন তিনি। সিঙ্গাপুরে অভিজাত ক্যাসিনো মেরিনা বে’তে গিয়ে যুবলীগের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে জুয়াও খেলতেন তিনি। আরমানের দুই ভাইও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত।
আরমান শুধু ক্যাসিনোতেই থেমে থাকেননি। বিভিন্ন সময় বিশেষ কোনো কাজের তদবিরে সুন্দরী নায়িকা-মডেলদের পাঠিয়ে কাউকে রাজি করানোর কাজটিও সুকৌশলে সারতেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন নাইট ক্লাব থেকে অনেক সময় নর্তকী বা গায়িকাকে টাকার বিনিময়ে উঠিয়ে আনতেন আরমান। রাজি না হলে জোরপূর্বক উঠিয়ে নেয়ার একাধিক অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঢাকা শহরের লা মেরিডিয়ান, সুইট ড্রিমসহ বিভিন্ন অভিজাত ড্যান্সবারে প্রায় প্রতি রাতেই লাখ লাখ টাকা উড়াতেও দেখা যেত তাকে।

আরমানের চাহিদার শেষ নেই। আরও প্রাপ্তির আশায়  তিনি একসময় এফডিসিতে চলচ্চিত্র তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে বেনামে সিনেমায় অর্থ লগ্নি করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নিজেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে জমিয়ে বসেন। দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া নামের চলচ্চিত্র প্রোডাকশন হাউসের প্রধান আরমান। গত ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত মনের মতো মানুষ পাইলাম না সিনেমাটির প্রযোজক আরমান। এটি আরমানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম ফিল্ম। এরপর  আরমানের প্রযোজনায় শাকিব খানের বিপরীতে নবাগতা এক নায়িকাকে নিয়ে আগুন নামের দ্বিতীয় ফিল্মের কাজও শুরু হয়। আরমানের প্রথম ফিল্মের মহরত অনুষ্ঠান হয় ঢাকা ক্লাবে। দ্বিতীয় ফিল্মের মহরত হয় জাঁকজমকভাবে হোটেল সোনারগাঁওয়ে। 

রাজধানীর ক্লাবপাড়াসহ বিভিন্ন ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনাকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাসূত্রে জানা যায়, ক্লাবপাড়ার পুরনোরা আরমানকে ক্যাসিনো বাণিজ্যের গুরু বলে জানেন। মূলত তার বুদ্ধিতেই ফুটবল ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো কারবার শুরু হয়। শুধু তাই নয়, ক্যাসিনো সামগ্রী নিজের টাকায় কিনে এনে যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় যুবলীগের প্রথম ক্যাসিনো কারবার শুরু হয়। এ অবৈধ ব্যবসা করে আরমান হাজার কোটিপতি বনে গেছেন। মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো জুয়া ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে অবস্থা বুঝে আরমান সটকে পড়ে। স্বজনদের মুখে শোনা যায় আরমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। 

gb

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More