সুন্দরগঞ্জে পুকুর-জলাশয় সংস্কারের অনিয়াম!

74
gb

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা প্রতিনিধি//

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জলাশয় সংস্কার ও পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পে নামমাত্র সংস্কার ও খনন কাজ করে জেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুফলভোগীদের অভিযোগ, জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রংপুর বিভাগে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প নামে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। জলাশয় সংস্কার ও পুকুর পুনঃখননের কথা বলে দায় সারা ভাবে মাটি খুঁড়ছে ঠিকাদারের লোকজন। সংস্কার কাজ সঠিকভাবে না হওয়ায় মাছ চাষ নিয়ে শঙ্কার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পরার আশঙ্কা করছে তারা। এতে করে মাছ চাষে উন্নয়নের নামে সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকা পানিতে যেতে বসেছে। তারা আরো বলেন,অধিকাংশ প্রকল্প এলাকাগুলোতে সাইনর্বোড না থাকায় সাধারণ মানুষ কাজ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছেন না। কর্মকর্তাদের যোগসাজসে দিনে-দুপুরে ঘটছে সংস্কার ও খনন কাজের নামে পুকুর চুরির ঘটনা। জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, সুন্দরগঞ্জে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জেলা মৎস্য বিভাগের অধীনে জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং রংপুর বিভাগে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের সংস্কার কাজে বরাদ্দ ৬৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। প্রকল্পের কাজ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে মার্চে শেষ হবার কথা থাকলেও এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। দুটি প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ১০টি স্কিমে জলাশয় এবং পুকুরে সংস্কার কাজ চলছে। দেখা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ (মরুয়াদহ খাস)কাচারী বাজার মাঝিপাড়ায় জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্র উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে বরাদ্ধ ধরা হয়েছে সাত লাখ ২১ হাজার টাকা। কোনো রকমে মাটি খুঁড়ে পাড় বাঁধা হয়েছে। ঘাসযুক্ত পুকুরের তলদেশে না খুঁড়েই ঢালের কাজ শেষ করা হয়েছে। উপজেলার অন্য প্রকল্প এলাকায় নেই কোনো সাইনবোর্ড। এই প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের লোকজনকে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে যেনতেনভাবেই চলছে সংস্কার কাজ। স্থানীয় প্রফুল­ চন্দ্র দাশ, সচিন চন্দ্র দাশ, মানিক চন্দ্র দাশসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, এখানে পুকুর সংস্কারের নামে যেন পুকুর চুরি হচ্ছে। সরকারের দেয়া উন্নয়নের নামে ঠিকাদাররা তাদের উন্নয়ন করছে। ফলে গরিব জেলেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন কোনদিন হয়নি হবেও না। এছাড়া একই প্রকল্পের আওতায় একই উপজেলার শান্তিরাম(ব্যাপারী পাড়া শষী বাবুর পুকুর)খাস পুকুর পুনঃখনন কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা। এখানেও ঘটেছে বড় ধরনের পুকুর চুরির ঘটনা। স্থানীয় জোব্বার মিয়া, সুরুজভান, দারুল ইসলাম রতন, ডা. মঞ্জু মিয়া সহ আরো কয়েকজন বলেন, সাইনবোর্ড না লাগানোর কারণে এখানে কত টাকার কাজ হচ্ছে আমরা তা জানি না। কোনো দিন ঠিকাদার বা কর্মকর্তাদেরকেও এখানে কাজের তদারকি করতে দেখা যায়নি। ফলে ঠিকাদারের লোকজন ইচ্ছে মতো কাজ করছে। একই চিত্র দেখা গেছে, শিবরাম বাবুর দিঘি পুনঃখনন, জামাল হাট পুকুর পুনঃখনন,পাথারী পুকুর পুনঃখনন ও সোনারায় বাবুর দিঘি পুনঃখনন কাজে। এছাড়া রংপুর বিভাগে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চাচীয়া মীরগঞ্জ আশ্রয়ন(গুচ্ছগ্রাম)পুনঃখনন কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। সেখানকার সুফলভোগী আব্দুল মালেক, মো. আমিনসহ অনেকেরই অভিযোগ,কাজ সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা না থাকায় ঠিকাদারের লোকজন ইচ্ছে মতো কাজ করছে। কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রমিকরা আমাদের বলেন, আপনারা এই কাজের কি বুঝবেন। ঠিকাদার আমাদের যেভাবে কাজ করতে বলছে সেই ভাবেই কাজ করছি। সুফলভোগীদের দলনেতা আব্দুল কাইয়ুম বলেন,এই কাজের স্ট্রীমেট, ডিজাইন ও নকশা জানতে আমি ঠিকাদার এবং জেলা মৎস্য অফিসের ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান আলীর সাথে কয়েক দফায় যোগাযোগ করেও পাইনি। তার মতে, প্রতিবছর এসব পুকুর খননের নামে টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই সরকার বরাদ্ধ দেয়। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি আমি উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তাদের অবগত করার পরেও তারা কেউ তদারকি করতে আসেননি। একই প্রকল্পের আওতায় একই উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর রঙ্ধসঢ়;গু মিয়ার বাড়ি হতে আমানত মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত বরোপীট পুনঃখনন কাজে ব্যয় ধরা হয় ২৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ,খননের সময় ওয়াবদা বাঁধের কিছু অংশ এমনভাবে কেটে ফেলা হয়েছ যে, আগামী বন্যায় হুমকির মুখে পড়তে পারে বাঁধ। অফিসার বা ঠিকাদারের কেউ এখানে আসে না। শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছে মতো কাজ করছে। বাঁধ ঘেঁষে জলাশয় সংস্কার করায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়বে। বিভিন্ন স্থানে বরোপীট খননের সময় পাশের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কাগজে-কলমে মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যরা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী হলেও বাস্তবে তার চিত্র ভিন্ন । কাগজ-কলমে মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যদের দেখিয়ে প্রকল্পে কাজ করছেন কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার। এদের মধ্যে সাঘাটার রাম ট্রেডাস,রায় ট্রেডাস ও মা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধীকারী বিজয় কুমার ও সুন্দরগঞ্জের সরকারদলীয় নেতা রেজাউল করিম রেজা উপর মহল ম্যানেজ করে কাজ নিয়ে আসে। তারাই মাঠ পর্যায়ে এই কাজ গুলো করে থাকেন। গরিব জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকায় এসব কাজ অলিখিত ঠিকাদাররাই করে থাকেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুদ দাইয়ান বলেন,কোথাও কোথাও অনিয়ম হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

gb

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More